চকমকে স্টেডিয়াম, কোটি কোটি টাকার লেনদেন আর বিশ্বজুড়ে গ্ল্যামারের আলোয় ঝলমলে মনে হয় ইংলিশ ফুটবল। তবে এই রঙিন পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক ভয়াবহ বাস্তব চিত্র সম্প্রতি সামনে এসেছে। ইংল্যান্ডের অধিকাংশ পেশাদার ফুটবল ক্লাব বর্তমানে চরম আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, ক্লাব মালিকেরা যদি অর্থের জোগান বন্ধ করে দেন, তবে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্লাব এক মাসও টিকে থাকতে পারবে না।
ইংল্যান্ডের নতুন স্বাধীন ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা (আইএফআর) তাদের ‘স্টেট অব দ্য গেম’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তুলে ধরেছে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে ইংল্যান্ডের শীর্ষ পাঁচ স্তরের মোট ৯৪ শতাংশ ক্লাবই লোকসানের সম্মুখীন হয়েছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, গত মৌসুমে ইংলিশ ফুটবলের মোট আয় ছিল প্রায় ৯০০ কোটি পাউন্ড। মূলত প্রিমিয়ার লিগের বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার কারণেই এই বিপুল পরিমাণ অর্থ অর্জিত হয়েছে। কিন্তু আয়ের এই বিশাল পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর আর্থিক সংকটের এক অন্ধকার খাদ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় সব ক্লাবই এখন টিকে থাকার জন্য সম্পূর্ণভাবে তাদের মালিকদের দেওয়া অর্থের ওপর নির্ভরশীল। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ক্লাব স্বীকার করেছে যে, মালিকেরা হঠাৎ অর্থ সহায়তা বন্ধ করে দিলে তারা ৯০ দিনের বেশি টিকে থাকতে পারবে না। তবে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্লাবের অবস্থা আরও করুণ; তাদের হাতে সময় থাকবে সর্বোচ্চ এক মাস।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, বর্তমান ইংলিশ ফুটবল এখন কার্যত ‘ঝুঁকিতে ঠাসা এক খেলা’। বিশেষ করে চ্যাম্পিয়নশিপ, লিগ ওয়ান এবং লিগ টু-এর ক্লাবগুলো প্রিমিয়ার লিগের বিপুল অর্থের আকর্ষণ পেতে নিজেদের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে খরচ করছে। এর ফলে তাদের ঋণের বোঝা ক্রমাগত বাড়ছে এবং তৈরি হচ্ছে অস্তিত্বের সংকট।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শেফিল্ড ওয়েনসডে, ডার্বি কাউন্টি, রিডিং এবং উইগানের মতো ক্লাবগুলো গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়েছে। ঋণের চাপে ২০১৯ সালে বিলুপ্ত হয়ে গেছে বুরি এবং তার পরের বছর বিলুপ্ত হয়েছে ম্যাকলসফিল্ড টাউন। আইএফআরের চেয়ারম্যান ডেভিড কোগান ও প্রধান নির্বাহী রিচার্ড মঙ্কস তাদের প্রতিবেদনে লিখেছেন, ‘ইংলিশ ফুটবলে যে মাত্রার আর্থিক ঝুঁকি স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছে, তা মোকাবিলায় আর সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই।’
আগামী ২০২৭ সালের শুরুতে এই বিষয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের কথা রয়েছে। এর আগে প্রিমিয়ার লিগ এবং ইংলিশ ফুটবল লিগকে (ইএফএল) রাজস্ব বণ্টনের বিষয়ে একটি নতুন চুক্তিতে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। এই বিষয়ে সমঝোতা না হলে সংস্থাটি নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগের হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। যদিও প্রিমিয়ার লিগ আগামী ১০ বছরে নিম্নস্তরের ক্লাবগুলোকে দেওয়া আর্থিক সহায়তা দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দিয়েছে, তবে এ নিয়ে আলোচনা এখনো চলছে।
ফুটবল সমর্থকদের সংগঠন ফুটবল সাপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান টম গ্রেটরেক্স এই প্রতিবেদনকে ইংলিশ ফুটবলের জন্য ‘বিপৎসংকেত’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, ব্রিটেনের সংস্কৃতিমন্ত্রী লিসা ন্যান্ডির বক্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ, ‘এই ক্লাবগুলো সমর্থকদের। সমর্থকদের ছাড়া এগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই।’