পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর এক চরম সংকটময় পরিস্থিতির কথা সামনে এসেছে। উপজেলার মোট ৭১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ১৫টিতে নিয়মিত প্রধান শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। বাকি ৫৬টি বিদ্যালয়েই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য হয়ে পড়ে আছে। এই শূন্য পদের প্রভাব পড়ছে সরাসরি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ওপর। বর্তমানে এই ৫৬টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৩টিতে সহকারী শিক্ষকেরা চলতি দায়িত্বে রয়েছেন এবং ৩৩টি বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে। প্রশাসনিক জটিলতা এবং পাঠদানের দ্বৈত চাপ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন শিক্ষকেরা, যার ফলে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এই সংকট নিরসনে দ্রুত শূন্য পদ পূরণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।
উপজেলার চর বেষ্টিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. রাজিব মিয়া। তিনি বর্তমান পরিস্থিতির কথা জানিয়ে বলেন, “আমাদের বিদ্যালয়ে প্রায় ৩৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। অথচ কর্মরত আছি মাত্র তিনজন শিক্ষক। আমি প্রায় দেড় বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছি। কোনো কারণে একজন শিক্ষক বাইরে থাকলে বাকি দুজনকে দুটি শ্রেণিতে পাঠদান করাতে হয়, ফলে অন্য একটি শ্রেণির পাঠদান বন্ধ থাকে। এতে আমাদের নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।”
একই ধরনের সংকটের কথা জানান নয়া ভাংগুনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. লিমন আনসারী। তিনি বলেন, “রাঙ্গাবালী উপজেলায় ৫৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষকদের দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। প্রশাসনিক দায়িত্ব ও পাঠদান একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে শিক্ষক সংকট প্রকট হয়ে উঠছে এবং শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন নিয়মিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।” উপজেলার অন্যান্য প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেও প্রায় একই চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এই শূন্যতার প্রভাব স্পষ্ট। চর হালিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী আক্ষেপ করে বলে, “আমাদের স্কুলে প্রধান শিক্ষক নেই। তাই আমরা ঠিকমতো ক্লাস করতে পারি না। আমরা চাই, অতিদ্রুত আমাদের স্কুলে একজন প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হোক।”
চর হালিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জাকির হোসেন দুলু তাঁর কষ্টের কথা ব্যক্ত করে বলেন, “একদিকে দাপ্তরিক কাজ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে শ্রেণিকক্ষে ক্লাস নিতে হচ্ছে। এ কারণে যথাযথভাবে পাঠদান করা কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুরোধ, তারা যেন দ্রুত রাঙ্গাবালী উপজেলায় প্রধান শিক্ষক সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন।”
অন্যদিকে, চতলাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ওবাইদুল ইসলাম মনে করেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে বিদ্যালয় পরিচালনা করায় শিশুদের পাঠদান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, “দ্রুত সময়ের মধ্যে শূন্য পদগুলোতে স্থায়ীভাবে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলে শিক্ষা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হবে এবং শিক্ষার গুণগত মান ধরে রাখা সম্ভব হবে।”
এই সংকটময় পরিস্থিতি সম্পর্কে পটুয়াখালী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. মাসুদ করিম জানান, দীর্ঘদিনের মামলাজনিত জটিলতার কারণে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল, যার ফলে বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই পদগুলো শূন্য হয়ে পড়েছিল। তবে বর্তমান সরকার সেই মামলাগুলোর সমাধান করেছে। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, “আমরা খুব দ্রুত পদোন্নতির মাধ্যমে শূন্য পদগুলো পূরণ করব। এ জন্য গ্রেডেশন তালিকাসহ পদোন্নতিসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। দ্রুতই তালিকা যাচাই-বাছাই শেষে এ সমস্যার সমাধান করা হবে।”