ইসলামে নেতৃত্ব একটি পবিত্র আমানত এবং গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। রাসুল (সা.) ছিলেন সামগ্রিক আধ্যাত্মিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নেতৃত্বের অধিকারী। জীবনের সব ক্ষেত্রে তিনি আদর্শ।

তিনি প্রত্যেক মুসলিমকে নেতৃত্বের দায়িত্ব সম্পর্কে অবহিত করে বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল; আর তোমরা প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭১৩৮)

নবীজির জীবনে নেতৃত্বের অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য ছিল। সেখান থেকে অন্যতম ও মৌলিক কয়েকটি গুণাবলি এখানে তুলে ধরা হলো।

নবীজির সততা ও বিশ্বস্ততা ছিল সর্বজনস্বীকৃত। তাঁর পরম শত্রুও তাঁকে মিথ্যাবাদী বলতে পারেনি এবং আল-আমিন (বিশ্বস্ত) উপাধিতে ভূষিত করেছিল। ব্যবসায়িক লেনদেন থেকে শুরু করে নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত তিনি সততা ও বিশ্বস্ততার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

এ বিষয়ে সতর্ক করে মহানবী (সা.) বলেন, ‘যার বিশ্বস্ততা নেই, তার ইমান নেই; আর যে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না, তার ধার্মিকতা নেই।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১২৩৮৩)

তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল শুধু এই কারণে যে যখন তাদের মধ্যে কোনো সাধারণ ও দরিদ্র মানুষ চুরি করত, তখন তারা তার ওপর দণ্ডবিধি কার্যকর করত; আর যখন কোনো প্রভাবশালী ও ধনী ব্যক্তি চুরি করত, তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত।

আবু জর (রা.) বলেন, আমি বললাম, ‘আল্লাহর রাসুল, আপনি কি আমাকে কোনো (রাষ্ট্রীয়) পদে নিযুক্ত করবেন না?’

তখন তিনি তাঁর হাত দিয়ে আমার কাঁধে চাপ দিলেন এবং বললেন, ‘আবু জর, তুমি তো একজন দুর্বল মানুষ (নেতৃত্বের ভার বহন করার ক্ষেত্রে) আর দায়িত্ব হলো একটি আমানত। আর কেয়ামতের দিন এটি হবে শুধুই লাঞ্ছনা ও অনুশোচনার কারণ। তবে সেই ব্যক্তির কথা ভিন্ন, যে ন্যায়ের সঙ্গে এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছে এবং অর্পিত সব হক ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করেছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮২৫)

রাসুল (সা.) সাবলীল ও স্পষ্টভাবে কথা বলতেন ও যোগাযোগ করতেন, যাতে শ্রোতারা সহজে তাঁর উদ্দেশ্য ও বক্তব্য বুঝতে পারে। এ সম্পর্কে আনাস (রা.) বলেন, ‘নবীজি যখন কোনো কথা বলতেন, তখন তিনি তা (প্রয়োজনবোধে) তিনবার পুনরাবৃত্তি করতেন, যাতে তাঁর কথাটি সঠিকভাবে বোঝা যায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৫)

রাসুল (সা.) ছিলেন অসাধারণ প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার অধিকারী। হিজরতের আগে হাজরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে কোরাইশদের মধ্যকার বিরোধ অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মেটানো এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক সন্ধি তাঁর অনন্য প্রজ্ঞার প্রমাণ বহন করে।

এ জন্যই তিনি বলেছেন, ‘প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্য ও বিচক্ষণতা হলো মুমিনের হারানো ধন। যেখানেই সে তা পাবে, সেটির সবচেয়ে বেশি হকদার হবে সে-ই।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৬৮৭)

ইনসাফ ছিল রাসুলের নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তিনি সামাজিক অবস্থান, বংশীয় মর্যাদা বা আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে কখনো কোনো বৈষম্য করেননি। আইনের দৃষ্টিতে ধনী-দরিদ্র, মুসলিম-অমুসলিম সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে আপন পরিবারের ওপরও আইন প্রয়োগের দৃঢ় ঘোষণা দিয়েছিলেন।

নিজেই বলেছেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল শুধু এই কারণে যে যখন তাদের মধ্যে কোনো সাধারণ ও দরিদ্র মানুষ চুরি করত, তখন তারা তার ওপর দণ্ডবিধি কার্যকর করত; আর যখন কোনো প্রভাবশালী ও ধনী ব্যক্তি চুরি করত, তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, যদি (নবী-কন্যা) ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৭৮৭)

মহানবী (সা.) যোগ্যতা ও দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিতেন। অযোগ্য লোকের হাতে দায়িত্ব অর্পণ সমাজ বা জাতির ধ্বংস ডেকে আনে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।

সহানুভূতি ও দয়া ছিল নবীজির নেতৃত্বের প্রধানতম ভূষণ। তিনি সাহাবিদের ক্ষুদ্রতম দুঃখ বা কষ্টও অনুভব করতেন এবং তাঁদের জন্য চিন্তিত থাকতেন।

কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের নিকট একজন রাসুল এসেছেন, তোমাদের যা কিছু কষ্ট দেয়, তা তার নিকট খুবই কষ্টদায়ক। সে তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি করুণাসিক্ত, বড়ই দয়ালু।’ (সুরা তওবা, আয়াত: ১২৮)

পেশাদার জীবনে একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে পরামর্শের মাধ্যমে কাজ করা রাসুলের নেতৃত্বের মৌলিক নীতি। তিনি সাহাবিদের সঙ্গে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত পরামর্শের (শুরা) মাধ্যমে গ্রহণ করতেন।

আবু হোরাইরা (রা.) বলেন, ‘আমি নবীজির চেয়ে অন্য কাউকে তাঁর সঙ্গীদের সঙ্গে বেশি পরামর্শ করতে দেখিনি। নবীজির এই আদর্শের পরিপ্রেক্ষিতেই আল্লাহ বলেছেন, ‘এবং তাদের (মুমিনদের) কাজসমূহ সম্পন্ন হয় নিজেদের পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে’ (সুরা শুরা, আয়াত: ৩৮)।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৭১৪)

পেশাগত ক্ষেত্রে যেকোনো কাজের সফলতা নির্ভর করে সঠিক ব্যক্তিকে উপযোগী দায়িত্ব দেওয়ার ওপর। মহানবী (সা.) যোগ্যতা ও দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিতেন। অযোগ্য লোকের হাতে দায়িত্ব অর্পণ সমাজ বা জাতির ধ্বংস ডেকে আনে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।

এক বেদুইন নবীজিকে প্রশ্ন করল, ‘কেয়ামত কবে হবে?’ তিনি বললেন, ‘যখন আমানত (সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা) হারিয়ে যাবে, তখন কেয়ামতের অপেক্ষা কোরো।’ বেদুইন লোকটি পুনরায় জিজ্ঞাসা করল, ‘কীভাবে আমানত হারিয়ে যাবে?’

নবীজি উত্তর দিলেন, ‘যখন কোনো দায়িত্বশীল পদ বা ক্ষমতা অযোগ্য ব্যক্তিদের হাতে অর্পণ করা হবে, তখন তুমি কেয়ামতের প্রতীক্ষা কোরো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯)

নবীজির দৃষ্টিতে নেতৃত্ব হলো মানুষের সেবা করার সুবর্ণ সুযোগ। একজন নেতা নিজেকে প্রভু ভাববেন না, বরং অধীনস্থদের কল্যাণের জন্য নিবেদিতপ্রাণ সেবক মনে করবেন।

তিনি বলেছেন, ‘সফর অবস্থায় দলের নেতাই হলেন মূলত তাঁদের সেবক। সুতরাং যে ব্যক্তি সেবা করার মাধ্যমে অগ্রগামী হয়, অন্য কোনো আমল দিয়ে তাকে ছাপিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়—একমাত্র শহীদ হওয়া ছাড়া।’ (শুআবুল ইমান, হাদিস: ৮০৫০)

তিনি সাহাবিদের শুধু আদেশ করতেন না, বরং নিজে দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকে কাজ করে জীবন্ত আদর্শ স্থাপন করতেন। মসজিদে নববি নির্মাণ বা খন্দকের যুদ্ধের পরিখা খননে তিনি সাহাবিদের সঙ্গে সমানভাবে মাটি কেটেছেন এবং পাথর বহন করেছেন।

বারা (রা.) বলেন, ‘খন্দকের যুদ্ধের দিন আমি নবীজিকে মাটি বহন করতে দেখেছি। মাটি বহন করতে করতে তাঁর পেট ধুলাবালিতে সম্পূর্ণ ঢেকে গিয়েছিল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪১০৪)

আমি ১০ বছর নবীজির খেদমত করেছি। কিন্তু তিনি কখনো আমার প্রতি “উফ” শব্দটিও করেননি। এ কথা জিজ্ঞাসা করেননি, তুমি এ কাজ কেন করলে এবং কেন করলে না?

কারও ভুলত্রুটি জনসমক্ষে বা সরাসরি নাম উল্লেখ করে লজ্জিত না করে মার্জিত ও পরোক্ষভাবে সংশোধন করার এক অনন্য শিক্ষা মহানবী (সা.) দিয়েছেন। তিনি ভুলকারীর নাম প্রকাশ না করে সবার উদ্দেশে নসিহতের মাধ্যমে বা ব্যক্তিগতভাবে বুঝিয়ে দিতেন।

আয়েশা (রা.) বলেন, একবার নবীজি নিজে কোনো কাজ করলেন এবং অন্যদের সেটা করার অনুমতি দিলেন। তা সত্ত্বেও একদল লোক তা থেকে বিরত রইল। এ সংবাদ তাঁর কাছে পৌঁছলে তিনি ভাষণ দিলেন এবং আল্লাহর প্রশংসার পর বললেন, ‘কিছু লোকের কী হয়েছে, তারা এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে চায়, যা আমি নিজে করছি। শপথ কোদার, আমি আল্লাহ সম্পর্কে তাদের থেকে বেশি জানি এবং আমি তাদের চেয়ে অনেক অধিক তাঁকে ভয় করি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১০১)

অধীনস্থদের সঙ্গে অত্যন্ত মানবিক আচরণ করা এবং তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত কাজের বোঝা না চাপানো নববি আদর্শের অংশ। অধীনস্থদের ভাইয়ের মর্যাদা দিয়ে তাদের সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে ও কষ্টের খেয়াল রাখতে হবে।

আনাস (রা.) বলেন, ‘আমি ১০ বছর নবীজির খেদমত করেছি। কিন্তু তিনি কখনো আমার প্রতি “উফ” শব্দটিও করেননি। এ কথা জিজ্ঞাসা করেননি, তুমি এ কাজ কেন করলে এবং কেন করলে না?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৩৮)

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মনে রেখো, তোমাদের অধীনস্থরা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদের তোমাদের আশ্রয়ে রেখেছেন। সুতরাং এমন কোনো ভাইয়ের অভিভাবকত্ব বা পরিচালনার ভার যদি কারও ওপর অর্পিত থাকে, তবে সে যেন তাকে তাই খাওয়ায় যা সে নিজে আহার করে, আর তাকে তেমনই পোশাক পরতে দেয় যেমনটা সে নিজে পরিধান করে। তোমরা তাদের ওপর তাদের সাধ্যাতীত কোনো কষ্টের কাজ চাপিয়ে দিও না। যদি কখনো কঠিন কাজের দায়িত্ব দাও, তবে নিজেরা হাত বাড়িয়ে দিয়ে তাদের সহযোগিতা করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩০)

নবীজির নেতৃত্বের এসব মৌলিক গুণ যেকোনো যুগের নেতৃত্ব, শাসনব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার জন্য এক কালজয়ী রূপরেখা। সততা, ইনসাফ, কল্যাণকামিতা ও সেবাবোধের সমন্বয়ে গঠিত তাঁর এই আদর্শ অনুসরণ করলেই সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার, শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

আবদুল্লাহিল বাকি: আলেম, লেখক ও প্রোগ্রামার

[email protected]