ময়মনসিংহের আলকেমি হাসপাতালে ২০১৪ সালে ওয়ার্ডবয় হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন উজ্জ্বল নামের এক তরুণ। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে তিনি আনম আয়াস নামে পরিচিতি লাভ করেন। এরপর থেকেই ময়মনসিংহের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে এই নামটি ব্যাপক আলোচনায় আসতে শুরু করে। বিভিন্ন সড়ক অবরোধ, অনশন, রাজনৈতিক কর্মসূচি, সংঘর্ষ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা ভিডিওর মাধ্যমে তাকে ঘিরে তৈরি হয় তীব্র বিতর্ক। একপর্যায়ে ময়মনসিংহের কর্মকাণ্ড শেষ করে তিনি রাজধানী ঢাকায় চলে আসেন, তবে সেখানেও তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ড থামেনি। সর্বশেষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে তিনি আবারও সংবাদ শিরোনামে আসেন।

মুক্তকণ্ঠের হাতে আসা বিভিন্ন নথিপত্রে তার নামের একাধিক রূপ পরিলক্ষিত হয়েছে। কোথাও তিনি আ ন ম আয়াস, কোথাও আল নূর মোহাম্মদ আয়াস, আবার কোথাও আল উজ্জ্বল আহমেদ হিসেবে পরিচিত। এসব নথিতে নামের এই ভিন্নতা, তার পেশাগত জীবনের বিভিন্ন পর্যায়, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং একাধিক বিতর্কিত ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে।

মুক্তকণ্ঠের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রতারণার একটি মামলায় তার নাম লেখা হয়েছে মো. আল-উজ্জ্বল আহমেদ। কারাগারের নথিতেও আল উজ্জ্বল আহমেদ নামটি ব্যবহৃত হয়েছে। অন্যদিকে, জন্মনিবন্ধনের অনুলিপিতে তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে আল নূর মোহাম্মদ আয়াস। ওই নথিতে তার জন্মতারিখ দেওয়া হয়েছে ১৮ নভেম্বর ২০০৫।

নাম ও পরিচয়ের এই ভিন্নতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও পুলিশের তথ্যানুসারে তার বিরুদ্ধে চেকসংক্রান্ত প্রতারণার একটি মামলা রয়েছে। ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবদুল্লাহ আল মামুন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “প্রতারণার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।”

পুলিশি তথ্যানুসারে, ২০২৩ সালের ১৮ জুলাই তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তী বছরের এপ্রিলে ওই মামলায় পরোয়ানা জারি হলে তিনি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান এবং পরবর্তীতে জামিনে মুক্তি পান।

আয়াস ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার বগিরপাড়া গ্রামের মোস্তফা কামাল ও খোরশেদা খাতুন দম্পতির সন্তান। তিনি ময়মনসিংহ নগরীর চরপাড়া এলাকায় বসবাস করতেন। বর্তমানে তিনি রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সদস্যসচিব হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

৫ আগস্টের পর বিভিন্ন দাবিতে সড়ক অবরোধ, অনশন এবং আওয়ামী লীগের কার্যালয় ভাঙচুরের মতো ঘটনায় তার নাম আলোচনায় আসে। এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়।

ময়মনসিংহের কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে জানান, গণ-অভ্যুত্থানের পর শহরে আয়াসকে ঘিরে নানা বিতর্ক তৈরি হয়। তাদের অভিযোগ, অল্প কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতেন এবং কখনও কখনও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠত। এসব কারণে স্থানীয় মানুষের একটি অংশ তার ওপর ক্ষুব্ধ।

এছাড়া তারাকান্দার বগিরপাড়া গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, আয়াসের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে এলাকায় তার সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। অনেকে ভয়ের কারণে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।

রাজধানী ঢাকায় আসার পর গত ৪ আগস্ট ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে নতুন ধারা বাংলাদেশ ও রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় আয়াস নিজেও মারধরের শিকার হন।

এর আগে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ও শহীদদের নিয়ে কটূক্তির অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন ধারা বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট শান্তা ফারজানাকে আয়াস চড় মেরেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির একপর্যায়ে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কয়েকজনকে মারধর করতে দেখা যায়। একটি ভিডিওতে আয়াসকে মাটিতে পড়ে যেতে এবং তাকে পাইপ দিয়ে আঘাত করতে দেখা যায়। অন্য একটি ভিডিওতে তাকে পাল্টা আঘাত করতেও দেখা যায়।

পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা নিতে যাওয়ার পরও দুপক্ষের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। আয়াসের ওপর হামলার অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় নতুন ধারা বাংলাদেশের কয়েকজন নেতাকে আসামি করা হয়।

এছাড়া গত ১৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ির সামনে আয়াসের নেতৃত্বে একদল লোক অবস্থান নিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। সেখানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া, ভিডিও ধারণ ও খাবার বিতরণকে কেন্দ্র করে তিনজনকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনাতেও আয়াসের নাম সামনে আসে।

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরেও ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন আয়াস। গত ২০ সেপ্টেম্বর মাগুরা শহরের কেশব মোড়ে ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বাড়ির ফটকে প্রস্রাব করার একটি ভিডিও তিনি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেছিলেন। ভিডিওটি প্রকাশের ঘটনাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়।

ময়মনসিংহ নগরীর আলকেমি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আসাদুজ্জামান আসাদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আয়াস ২০১৪ সালে উজ্জ্বল নামে ওয়ার্ডবয় হিসেবে আলকেমি হাসপাতালে চাকরিতে যোগ দেন। প্রায় তিন বছর ওই পদে কাজ করেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালে নগরীর ইউনিভার্সেল হাসপাতালে এক্সিকিউটিভ পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।”

তিনি আরও বলেন, “ওয়ার্ডবয় থেকে হঠাৎ করেই এক্সিকিউটিভ পরিচালক হয়ে যান আয়াস। আয়াস কীভাবে এসব করছে, তার অতীত সম্পর্কে অনেকেই জানেন।”

আয়াসের বাবা মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, তিনি হৃদরোগে ভুগছেন এবং কাজ করতে পারেন না। তার স্ত্রীর মাসিক আট হাজার টাকা বেতনের আয়ে সংসার চলে বলে জানান তিনি।

ছেলের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে মোস্তফা কামাল বলেন, “আয়াসকে অহেতুক গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে দ্রুত মুক্তি দেওয়া উচিত।”

অন্যদিকে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবদুল্লাহ আল মামুন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আয়াসের বিরুদ্ধে চেকসংক্রান্ত একটি প্রতারণার মামলা রয়েছে। এটি একটি সিআর মামলা। প্রতারণার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।”