আজ বুধবার সকাল সাড়ে আটটা। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া ডাকবাংলোর পাশে বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্ত ঘেঁষে বয়ে যাওয়া মহানন্দা নদীর পাড়ে তখন পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। সেখানে দাঁড়িয়ে উত্তরের আকাশে ভেসে থাকা কাঞ্চনজঙ্ঘার মোহময় দৃশ্যের ছবি তুলছিলেন নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা ২৮ বছর বয়সী তরুণ রনি আহমেদ। দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে হিমালয়ের পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার এমন দুর্লভ দৃশ্য দেখার সুযোগ পেয়ে এবং তা ক্যামেরাবন্দি করতে পেরে তিনি ভীষণ অভিভূত।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানাতে রনি আহমেদ বলেন, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে এমন খবর শুনে গতকাল (মঙ্গলবার) রাতে নারায়ণগঞ্জ থেকে বাসে রওনা দিয়েছি। দীর্ঘ ১০ ঘণ্টার বেশি সময় জার্নি করে অবশেষে দেখা পেয়েছি। জীবনের প্রথম কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন আমার। মনের মতো কয়েকটা ছবি তুলতে পেরে খুবই ভালো লাগছে। দেশের মাটি থেকে এভাবে কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা পাওয়াটা সত্যিই ব্যতিক্রম অভিজ্ঞতা।’
শুধুমাত্র রনি আহমেদই নন, কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে এবং সেই স্মৃতি ধরে রাখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা ভিড় করছেন দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়। কেউ কেউ এই পর্বতশৃঙ্গের একনজর ঝলক দেখতে রাতেও তেঁতুলিয়ায় অবস্থান করছেন।
তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো-সংলগ্ন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ঘেঁষে বয়ে যাওয়া মহানন্দা নদীর পাড়ে দাঁড়ালে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য সবচেয়ে স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। সূর্যের আলোর পরিবর্তনের সাথে সাথে এই পর্বতশৃঙ্গ ভিন্ন ভিন্ন রূপে রং বদলাতে দেখা যায়।
শরতের শেষ প্রান্তে এসে তেঁতুলিয়ার আকাশ কখনো শান্ত ও স্বচ্ছ নীল হয়ে থাকে, আবার কখনো মেঘলা কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে। সন্ধ্যা নামলেই বইছে শীতল বাতাস। এই সময়ে আকাশ পরিষ্কার থাকলে পঞ্চগড় জেলা শহরসহ তেঁতুলিয়া উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য দেখা যায়।
গত সোমবার থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা হালকা দৃশ্যমান হতে শুরু করে, তবে আজ ভোর থেকেই তা অত্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। প্রতি বছর অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে নভেম্বরের প্রায় শেষ পর্যন্ত কাঞ্চনজঙ্ঘার এই দৃশ্য দেখা যায়।
ভোরে সূর্যোদয়ের আগে মনে হয় কাঞ্চনজঙ্ঘা যেন সাদা রঙে ঢেকে আছে। সূর্যের আলো পর্বতশৃঙ্খে পড়ার সাথে সাথে তা কাঁচা সোনার রঙ ধারণ করে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে সেই কাঁচা সোনার রঙ বদলে গিয়ে পুনরায় শ্বেতশুভ্র হয়ে ওঠে। বিকেলে পশ্চিমে হেলে পড়া সূর্যের সোনালি আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘা আবারও রং বদলের খেলায় মেতে ওঠে।
কাঞ্চনজঙ্ঘার এই আকর্ষণকে কেন্দ্র করে বর্তমানে পঞ্চগড় ও তেঁতুলিয়া পর্যটকদের ভিড়ে মুখর। এর ফলে স্থানীয় হোটেল-রেস্তোরাঁ, আবাসিক হোটেল এবং রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইকের মতো ছোট যানবাহনের চালকদের ব্যস্ততা বহুগুণ বেড়েছে।
দুই বছর বয়সী ছেলে এবং স্বামীর সাথে নওগাঁ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে এসেছেন মাহমুদা খানম নামের এক নারী। তিনি বলেন, ‘এত দিন কাঞ্চনজঙ্ঘা শুধু ছবিতে দেখেছি। এবার তেঁতুলিয়ায় এসে বাস্তবে দেখতে পেয়ে খুবই আনন্দিত আমি।’
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছেন ট্যুরিস্ট পুলিশ। পঞ্চগড় জোনের উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল আজিজ জানান, পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য তাঁরা কাজ করছেন। পর্যটকদের যাতে কোনো হয়রানি শিকার হতে না হয়, সেটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।