পাবনার ভাঙ্গুড়ায় একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসায় অবহেলার কারণে একই দিনে দুই নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের চিকিৎসক না থাকায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করানো এবং আয়া দিয়ে প্রসব করানোর চেষ্টার কারণেই এই ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ স্বজনদের।

‎মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সন্ধায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে থানায় ও জেলা সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। এর আগে গত ‎শনিবার (১০ অক্টোবর) উপজেলার শরৎনগরে অবস্থিত ‘ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ার লিমিটেড’ ক্লিনিকে এ ঘটনা ঘটে।

‎অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, প্রসবব্যথা শুরু হলে গত শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ার ক্লিনিকে ভর্তি হন উপজেলার চৌবাড়িয়া দক্ষিণপাড়ার তারেক হোসেনের স্ত্রী মুসলিমা আক্তার মনা। কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত রক্তের ব্যবস্থা করা হলেও সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সার্জন না থাকায় তাকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। পরে চিকিৎসক এসে অস্ত্রোপচার করলেও নবজাতকের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। এরপর শিশুটিকে পাবনা সদর হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেয় কর্তৃপক্ষ। তবে হাসপাতালে নেওয়ার পথে শিশুটির মৃত্যু হয়।

‎মুসলিমা আক্তার মনার স্বামী তারেক হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের বাচ্চা গত দুই দিন আগে জন্মের পরেই মারা গেছে। আমার স্ত্রী এখন পর্যন্ত জানেন না, তাকে জানানোর মতো পরিস্থিতিও নেই এখন। সিজারের জন্য ডাক্তার ছিল না– বিভিন্ন অজুহাতে আমাদের তিন থেকে চার ঘণ্টা দেরি করিয়েছে, এ জন্যই এমন হয়েছে। আমি এই নির্মম ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।’

‎মনার ননদ মৌসুমী খাতুন বলেন, ‘আমরা এই ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বলেছি আমাদের রোগীকে সিজার করান। তারা বিভিন্ন অজুহাতে আমাদের অনেক সময় দেরি করিয়েছে। বলেছে, এই তো ডাক্তার চলে এসেছে– এমন করে করে আমাদের আশ্বস্ত করেছে। সঠিক সময়ে সিজার করা হলে ভাবি সুস্থ থাকতেন এবং ভাতিজাও জীবিত থাকত।’

মনার শ্বশুর আইয়ুব আলী বলেন, ‘আমরা এই ক্লিনিকে শুধু সিজার করার উদ্দেশ্যেই নিয়ে গিয়েছিলাম। তাদের ডাক্তার নেই, সেটি না জানিয়ে আমাদের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে এত বড় ক্ষতি করল।’

‎একই দিনে ওই ক্লিনিকে আরেক নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের মাসুদ রানার স্ত্রী অন্তরা খাতুনের প্রসববেদনা উঠলে শনিবার সকাল ১০টার দিকে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান পরিবারের সদস্যরা। স্বজনদের অভিযোগ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সিজারিয়ান অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের প্রায় তিন-চার ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও চিকিৎসক না আসায় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ সেখানে কর্মরত এক আয়াকে দিয়ে স্বাভাবিক প্রসব করায়। সন্তান জন্মের পর নবজাতকের কোনো সাড়া না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। পরে নবজাতককে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

‎অন্তরা খাতুন বলেন, ‘দশ মাস সন্তান পেটে রাখার পর এখন সেই সন্তান কোলে নাই, এটা খারাপ লাগবে না, সেটা কোনো মা-ই বলতে পারবে না। সিজারের জন্য হাসপাতালে নিয়ে গেলে তারা কেন নরমালে চেষ্টা করবে? ডাক্তার না থাকলে সেটা জানিয়ে সঙ্গে সঙ্গে অন্য ব্যবস্থা করার কথা বলতে হবে। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দ্রুত বিচার চাই।’ অন্তরা খাতুনের স্বামী মাসুদ রানা বলেন, ওই ক্লিনিকে ঠিকমতো প্রয়োজনীয় ডাক্তার পাওয়া যায় না। ডাক্তার না থাকলেও তারা মিথ্যা আশ্বাস দেয়।

‎এদিকে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ার লিমিটেড হাসপাতালটির লাইসেন্সের মেয়াদ গত জুলাই মাসে শেষ হয়েছে। তবে এখনো লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি।

‎অভিযোগের বিষয়ে ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ার লিমিটেড ক্লিনিকের পরিচালক মো. আবদুল জব্বার বলেন, ‘আমাদের এখানে সার্বক্ষণিক ডাক্তার থাকে। সিজার দেরিতে করানো হয়েছে রোগীর স্বজনদের পরামর্শ অনুযায়ী। তারা বললে সঙ্গে সঙ্গে সিজার করানো হতো।’ লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমাদের টাকা জমা দেওয়া আছে, তবে এখনো রিনিউ হয়নি। আমাদের মতো অনেকেরই এ রকম আছে।’

‎এ বিষয়ে ভাঙ্গুড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাকিউল আজম বলেন, ‘আমি প্রথমে ফেসবুকের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারি। এখন লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

‎পাবনার সিভিল সার্জন মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘অভিযোগে ঘটনাটি যেভাবে বলা হয়েছে সেটি যদি হয়ে থাকে, তাহলে আসলেই কর্তৃপক্ষ তাদের কাজে কিছুটা অবহেলা করেছে। এ ধরনের কাজ তারা বারবার করতে থাকলে বিধি মোতাবেক আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’