মাদারীপুরে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। বাইরে ঝকঝকে সাইনবোর্ড, নামের পাশে ‘জেনারেল হাসপাতাল’ কিংবা ‘ডিজিটাল ল্যাব’-দেখে মনে হতে পারে, আধুনিক চিকিৎসাসেবার সব আয়োজনই রয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। কোথাও চিকিৎসকের উপস্থিতি নিয়ে সংশয়, কোথাও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, আবার কোথাও লাইসেন্স বাতিলের পরও কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ।
জেলার পাঁচটি উপজেলায় ১৭৭টি বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে লাইসেন্স রয়েছে মাত্র ১৪টির-এমন তথ্য পাওয়া গেছে অনুসন্ধানে। তবে বাকি ১৬৩টি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যসেবার মতো সংবেদনশীল খাতে এমন চিত্র সামনে আসায় রোগীদের নিরাপত্তা, প্রতিষ্ঠানের মান এবং তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না করেই রোগীদের কাছ থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে অর্থ নিচ্ছে। কোথাও চিকিৎসক ও জনবলের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন, কোথাও সেবার পরিবেশ নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে রোগীদের।
লাইসেন্স বাতিল, তবু চলছে হাসপাতাল
মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার টেকেরহাটে অবস্থিত টেকেরহাট জেনারেল হাসপাতালের কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রয়োজনীয় নিয়মনীতি অনুসরণ ও শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় ২০২২ সালে স্বাস্থ্য বিভাগ প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স বাতিল করে। এরপরও দীর্ঘ সময় ধরে হাসপাতালটির কার্যক্রম চালু থাকার অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে হাসপাতালটির ভেতরে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও অব্যবস্থাপনার চিত্র দেখা গেছে বলে জানা গেছে। সার্বক্ষণিক চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও নির্ধারিত চিকিৎসকের কক্ষে তালা ঝুলতে দেখা যায়। এতে জরুরি প্রয়োজনে রোগীরা তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। এতে চরম বিপাকে পড়েন রোগী ও স্বজনেরা।
টিনশেড ঘরে হাসপাতাল, সাইনবোর্ডে চিকিৎসকদের ছবি
টেকেরহাটের পাঁচতলার মোড় এলাকায় অবস্থিত লাইফ কেয়ার ডিজিটাল ল্যাব ও হাসপাতালের কার্যক্রম নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে দোতলার একটি টিনশেড ঘরে। বাইরে ঝকঝকে সাইনবোর্ডে স্বনামধন্য চিকিৎসকদের ছবি ও পরিচিতি ব্যবহার করা হলেও বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা চিকিৎসকেরা নিয়মিত সেখানে রোগী দেখেন কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।
আর এই হাসপাতালের মূল কাজ হলো রোগী সংগ্রহ করে অন্য ক্লিনিকে বিক্রি করে দেওয়া। এমন অভিযোগ করেছেন কয়েকজন রোগী ও তাদের প্রতিবেশীরা।
অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছে এমন বাস্তব চিত্র। হাসপাতাল খুলে বসেছে ঠিকই, কিন্তু রোগী বিক্রি হচ্ছে অন্য হাসপাতালে। চিকিৎসা নিতে আসা সাবের ইসলাম জানান, আমি এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এলে তারা নিয়ে যান আমাকে অন্য হাসপাতালে। পরে বুঝতে পেরেছি, সেখানে তাদের কোনো চিকিৎসা কার্যক্রম হচ্ছে না।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, টেকেরহাট বন্দরে এক ডজনের বেশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনগুলো বৈধ অনুমোদন নিয়ে চলছে, কোনগুলোর আবেদন প্রক্রিয়াধীন এবং কোনগুলোর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে-তা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পরীক্ষার পর পরীক্ষা দিতে বলে
রাজৈর উপজেলার আমগ্রাম থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মালতি বাড়ৈ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পেটে ব্যথা নিয়ে গত সোমবার লাইফ কেয়ার ডিজিটাল ল্যাব ও হাসপাতালে যাই। তারা আমাকে বেশ কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বলেন। আমার শুধু পেটে ব্যথা ছিল, কিন্তু তারা একের পর এক পরীক্ষার পরামর্শ দেন। পরে আমি সেখানে চিকিৎসা নিতে না চাইলে তারা বলেন, এখানে এলে চিকিৎসা নিতে হবে। তাদের কর্মকাণ্ডে আমি আরও অসুস্থ বোধ করি। পরে জানতে পারি, সেখানে ভালো চিকিৎসক নেই। এ ধরনের হাসপাতালগুলো সরকারি নজরদারির আওতায় আনা দরকার, না হলে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়বে।
চিকিৎসা নিতে আসা আরেক ব্যক্তি সজিব বাড়ৈ বলেন, সেখানে ভালোভাবে চিকিৎসা হয় না বলে মনে হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বেসরকারি ক্লিনিকগুলো নিয়মিত তদারকি করা দরকার।
১৭৭ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অনুমোদন মাত্র ১৪টির
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাদারীপুরের পাঁচটি উপজেলায় ৭১টি বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালের মধ্যে লাইসেন্স রয়েছে মাত্র সাতটির। অন্যদিকে, ১০৬টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে অনুমোদন নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে সাতটি প্রতিষ্ঠান।
হিসাব অনুযায়ী, দুই শ্রেণির মোট ১৭৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৪টি। বাকি ১৬৩টির লাইসেন্স ও অনুমোদনের বর্তমান অবস্থা স্পষ্ট করা জরুরি। কারণ, আবেদন করা, আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকা, লাইসেন্স নবায়নের অপেক্ষায় থাকা এবং সম্পূর্ণ অনুমোদনহীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা-এগুলো এক বিষয় নয়। তবে এ সকলের বিষয়ে আট-নয় বছর যাবৎ নবায়নের জন্য আবেদন করে রাখা হয়েছে বলেও জানিয়েছে একটি সূত্র। আবেদন তাদেরকে কী কারণে নবায়ন দেওয়া হচ্ছে না, এ বিষয়ে সিভিল সার্জন অফিস থেকে জানানো হয়, অধিকাংশেরই কাগজপত্র ঠিক নেই।
আবেদন করলেই কি চালানো যায় স্বাস্থ্যসেবা
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কিছু প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় শর্ত পুরোপুরি পূরণ না করেই লাইসেন্সের জন্য আবেদন করছে। বিভিন্ন দপ্তরের কাগজপত্র সংগ্রহ এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জটিলতার কারণে অনেক মালিক পরবর্তী ধাপগুলো সম্পন্ন করতে পারছেন না বলেও জানা গেছে।
তবে লাইসেন্সের আবেদন করা আর লাইসেন্স পাওয়া এক বিষয় নয়। প্রশাসনিক জটিলতা থাকলেও তা অনুমোদন ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনার বৈধতা নিশ্চিত করে না। ফলে আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকার অজুহাতে কোনো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন কার্যক্রম চালালে সেটির আইনগত অবস্থান যাচাই করা প্রয়োজন।
এখানে প্রশ্ন শুধু প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম নিয়ে নয়; বরং অনিয়ম শনাক্ত করা, অনুমোদন যাচাই, নিয়মিত পরিদর্শন এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তরগুলোর কার্যক্রম নিয়েও। বছরের পর বছর কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিচালিত হলে তা তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। তবে এ সব বিষয়ে সচেতন মহল বলছে, অভিযান পরিচালনার দপ্তরগুলো ঠিকমতো অভিযান না করার কারণে এবং এসব ক্লিনিকের সঙ্গে তাদের আর্থিক যোগসূত্র থাকার কারণেই হরহামেশা লাইসেন্সবিহীন হাসপাতালের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
ঝুঁকিতে রোগীরা, দায় নেবে কে
চিকিৎসা নিতে আসা অধিকাংশ রোগী হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সাইনবোর্ড, চিকিৎসকের নাম এবং কর্মীদের আশ্বাসের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের বৈধ লাইসেন্স আছে কি না, পরীক্ষার যন্ত্রপাতি যথাযথ কি না কিংবা রিপোর্ট তৈরির জন্য দক্ষ জনবল রয়েছে কি না-এসব যাচাই করা সাধারণ রোগীদের পক্ষে কঠিন। ফলে অনিয়মের অভিযোগ থাকা প্রতিষ্ঠানে সেবা নিতে গিয়ে ভুল রোগ নির্ণয়, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা কিংবা যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে রোগীর আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি শারীরিক জটিলতাও দেখা দিতে পারে। তাই বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও সেবার মান নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সচেতন মহলের মতে, জেলার সব বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স যাচাই, নিয়মিত পরিদর্শন, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের আশ্বাস, এবার বাস্তব পদক্ষেপের অপেক্ষা
অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে শিগ্গিরই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথা জানিয়েছে প্রশাসন। তবে শুধু অভিযান ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে কার্যকর পদক্ষেপ, নিয়মিত তদারকি এবং অভিযানের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মাদারীপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শরীফুল আবেদীন কমল বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিকের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। এখনো যারা লাইসেন্স নবায়ন করেননি, তারা অতিশিগগিরই নবায়ন কার্যক্রম শেষ না করলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। এ ছাড়া যাদের ক্লিনিকের লাইসেন্স নেই, তাদের তালিকা করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে এ বিষয়ে মাদারীপুর জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সবিহীন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে, সেসব প্রতিষ্ঠানকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হবে।