অল্প সময়ের ব্যবধানে নেপালে দুটি বড় বন্যার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে আগস্টের বন্যাটি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। সর্বশেষ ১১ অক্টোবর আবারও বন্যার তাণ্ডব দেখা যায়। হিমালয়ের পাদদেশে ঘটা এই ধরনের দুর্যোগ কেবল নেপালের জন্য নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা। বন্যার প্রকৃত কারণ, আগাম সতর্কব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং এই পরিস্থিতি থেকে আঞ্চলিকভাবে কী শিক্ষা নেওয়া সম্ভব—সেই বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইসিমডের দুর্যোগঝুঁকি হ্রাস বিভাগের ইন্টারভেনশন ম্যানেজার শাশ্বত সান্যাল মুক্তকণ্ঠের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁর এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন পার্থ শঙ্কর সাহা।
হিমালয়ের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এই অঞ্চলে দুর্যোগের ইতিহাস দীর্ঘ। তবে জলবায়ু উষ্ণায়নের ফলে বন্যার তীব্রতা বা ঘনত্বের পরিবর্তন ঘটছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে শাশ্বত সান্যাল জানান, হিমালয় একটি নবীন, খাড়া ঢালবিশিষ্ট এবং ভূমিকম্পপ্রবণ পর্বতমালা, তাই এখানে দুর্যোগের ইতিহাস আগে থেকেই বিদ্যমান। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, "ফোটকোশি নদী অববাহিকায় ২০২৫ সালের জুলাইয়েও বন্যা হয়েছিল। তখন নেপালের জাতীয় দুর্যোগঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিআরআরএমএ) জানিয়েছিল, উজানের একটি হিমবাহ হ্রদ থেকে পানি বেরিয়ে এ বন্যা হয়েছে।"
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন যে, ২০২৬ সালের দুটি ঘটনার ধরন এক ছিল না। আগস্টের রাসুয়া-গিরং বন্যার সূত্রপাত হয়েছিল উচ্চ পার্বত্য এলাকায় শিলা ও বরফের ধসে। অন্যদিকে, বুড়িগণ্ডকীর বন্যার কারণ হিসেবে এনডিআরআরএমএ প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে যে, একটি ভূমিধসে উপনদীর পানি আটকে গিয়েছিল এবং পরবর্তীতে সেই বাঁধ ভেঙে বন্যা হয়। এই ঘটনার সঙ্গে হিমবাহ বা বরফের কোনো যোগসূত্র এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
উষ্ণায়নের প্রভাব মূলত উচ্চ পার্বত্য এলাকার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, যেমন হিমবাহ পাতলা হয়ে যাওয়া, পারমাফ্রস্ট বা স্থায়ীভাবে জমে থাকা মাটি গলে যাওয়া এবং বরফ গলার পানি বৃদ্ধি পাওয়া। এই প্রভাবকে ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি থেকে আলাদা করতে সান্যাল কয়েকটি প্রমাণের কথা উল্লেখ করেন। প্রথমত, স্যাটেলাইটের পুরোনো তথ্য ব্যবহার করে কয়েক দশকের দুর্যোগের তালিকা তৈরি করা, তবে তথ্যের অসম্পূর্ণতা দূর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভূমি ও হিমবাহের উচ্চতার পরিবর্তন নিয়মিত মাপা এবং রাডারভিত্তিক ইনস্যাট প্রযুক্তিতে ভূমিধসপ্রবণ ঢাল পর্যবেক্ষণ করা। তৃতীয়ত, ধসের উৎসের তাপমাত্রা ও পারমাফ্রস্টের তথ্য সংগ্রহ করা। চতুর্থত, কোনো দুর্যোগকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল না বলে দুর্যোগপূর্ব ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সঙ্গে উষ্ণায়নের সম্পর্ক যাচাই করা। এছাড়া নদী উপত্যকার তলদেশে বসতি, সড়ক ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্র বৃদ্ধির ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়েছে বলে তিনি মনে করেন।
সতর্কবার্তার সময়কাল নিয়ে আলোচনায় উঠে আসে যে, ১১ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৫ মিনিটের দিকে স্থানীয় বাসিন্দারা একে অন্যকে সতর্ক করতে শুরু করেন। তবে সরকারি সতর্কবার্তা আসে পরে। অরুঘাট পুলিশ ফাঁড়ি প্রথম সরকারি সতর্কবার্তা দেয় ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডি) এবং এনডিআরআরএমএ প্রথম খবর পায় সকাল ৬টার দিকে এবং সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে গণখুদে বার্তা পাঠানো হয়। শাশ্বত সান্যাল বলেন, "দুর্যোগের উৎসস্থল থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার ভাটিতে অরুঘাটে সবচেয়ে কাছের স্বয়ংক্রিয় পানির উচ্চতা মাপার যন্ত্রটি রয়েছে। তাই এফএফডিকে বাসিন্দা ও সরকারি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।"
তিনি মনে করেন, সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া ঠিক থাকলেও মূল চ্যালেঞ্জ হলো মাঠপর্যায়ের খবর দ্রুত যাচাই করে অনুমোদিত সতর্কবার্তায় রূপান্তর করা, যাতে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে বার্তা না যায়। দুর্গম পাহাড়ি উপত্যকায় পর্যবেক্ষণের সীমাবদ্ধতা দূর করতে তিনি কয়েক স্তরের ব্যবস্থার কথা বলেন। এর মধ্যে রয়েছে স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, ভূকম্পন শনাক্তকরণ এবং উজানে সেন্সর বসানো। তিনি বলেন, "পানির উচ্চতা যে হারে বাড়ে, অনেক সময় তথ্য সার্ভারে পৌঁছানোর আগেই সেই পরিবর্তন ঘটে যায়। ফলে পানির উচ্চতা বাড়ার গতি ধরা পড়ে না। সেন্সর থেকে তথ্য আসা বন্ধ হয়ে গেলেও সতর্কবার্তা চালু হওয়া উচিত; এর অর্থ সেন্সরটি হয়তো পানিতে ভেসে গেছে।"
বন্যায় অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে সান্যাল জানান, বর্তমান পরিকল্পনা ও প্রকৌশল নীতিমালা এই ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়। নেপাল সরকারের হিসাব অনুযায়ী, দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৭৪ কোটি মার্কিন ডলার, যার ৭৫ শতাংশই অবকাঠামো খাতে। তিনি মনে করেন, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো পুনর্গঠনের সময় বহুমুখী ঝুঁকি বিবেচনা করে ভূমি ব্যবহার নির্ধারণ করা, নির্মাণশ্রমিক ও কর্মীদের আবাসন নদী উপত্যকার তলদেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সক্ষমতা যাচাই করা। বিশেষ করে, "জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমতিপত্রে উজানের বহুমুখী ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ ও মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করা" প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য এই ঘটনার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শাশ্বত সান্যাল বলেন, "বাংলাদেশের জন্য সরাসরি কোনো ভৌত ঝুঁকি নেই। বুড়িগণ্ডকী নদী ত্রিশূলীতে মিশেছে। ত্রিশূলী পরে নারায়ণী বা গণ্ডক হয়ে গঙ্গায় পড়েছে। আগস্টের আরও বড় বন্যাটিও দক্ষিণ নেপালের দেবঘাটে পৌঁছানোর আগেই স্বাভাবিক মাত্রায় নেমে এসেছিল।"
তবে বাংলাদেশের জন্য এই ঘটনার শিক্ষা হলো প্রস্তুতি ও পর্যবেক্ষণ। তিনি বলেন, দ্রুত শুরু হওয়া বন্যার জন্য কয়েক স্তরের সতর্কবার্তা ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যেখানে শুধু ভাটির যন্ত্রের ওপর নির্ভর না করে স্যাটেলাইট ও ভূকম্পন শনাক্তকরণ ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া স্থানীয় মানুষের খবর যাচাই করে দ্রুত সরকারি সতর্কবার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) একটি উদাহরণ হতে পারে। তিনি আরও বলেন, "উজানের পানিপ্রবাহের তথ্য সময়মতো ও বাস্তব সময়ে ভাগাভাগি করা। পাশাপাশি যৌথ নদীব্যবস্থায় পলি জমা বা প্রবাহের পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা করা।"
পরবর্তী বড় দুর্যোগের আগে নেপাল ও আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর জন্য তিনটি জরুরি পদক্ষেপের কথা বলেন সান্যাল। প্রথমত, জাতীয় পর্যায়ে সতর্কবার্তা থেকে পদক্ষেপ নেওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম চালু করা, যার নেতৃত্বে থাকবে এনডিআরআরএমএ। দ্বিতীয়ত, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নদী অববাহিকায় স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ ও উজানে সেন্সর বসানো, যার নেতৃত্বে থাকবে ডিএইচএম। তৃতীয়ত, পুনর্গঠনে বহুমুখী ঝুঁকি বিবেচনা করে ভূমি ব্যবহার নির্ধারণ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা করা। তিনি স্পষ্ট করেন যে, "জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমতিপত্রে উজানের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ ও মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা যুক্ত করতে হবে।"