সারা দেশে আগামীকাল বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বিক্রি বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এই কর্মসূচির মাধ্যমে বাজারে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করা হলে সরকার আইনগত ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
সচিবালয়ে আজ বুধবার এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠক শেষে আয়োজিত তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, “পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটিয়ে বারবার দাম বাড়ানোর চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যবসায়ীদের আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে।”
জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে মন্ত্রী জানান, বৈশ্বিক সংকটের কারণে এলপিজি আমদানি ও সরবরাহে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ব্যাপক ওঠানামা এবং আমদানির উৎস নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও সাধারণ ভোক্তাদের জন্য সহনীয় মূল্যে এলপিজি সরবরাহের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে সরকার।
মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খাতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এর ফলে বাংলাদেশের বেসরকারি আমদানিকারকদেরও বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে হচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদে সরবরাহে ঘাটতি এড়ানো এবং আগামী বছর পর্যাপ্ত এলপিজি সরবরাহ নিশ্চিত করার কৌশল নিয়ে অপারেটরদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে তিনি জানান।
বাজারের সরবরাহ ও দাম স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। মন্ত্রী জানান, ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং আগামী ৩০ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা করা হবে।
পাশাপাশি, ডিলার পর্যায়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি ঠেকাতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনকে সক্রিয় করার কথা জানান জ্বালানিমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে এলপিজির দাম বেশি হওয়ার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ভারতে সরকার ভর্তুকি প্রদান করে এলপিজির দাম কম রাখে এবং নির্দিষ্ট কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগীরা সেখানে এলপিজি পান। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো ভর্তুকি ব্যবস্থা নেই। এখানে বেসরকারি আমদানিকারকেরা এলপিজি আমদানি করে উন্মুক্ত বাজারে বিক্রি করেন, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সরাসরি প্রভাব দেশের বাজারে পড়ে।
একই সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, এলপিজির সরবরাহ ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করছে সরকার। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “দাবি আদায়ে ধর্মঘটের মাধ্যমে বাজারে অস্থিরতা তৈরি করা হলে তা বরদাশত করা হবে না।”
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও জানান, সরকার সরাসরি এলপিজি আমদানি করে না, বরং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই এটি আমদানি করে। তবে বিইআরসি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে থাকে। ব্যবসায়ীদের লাভ–লোকসান এবং কমিশনসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়ীদের কথা শুনতে ও যৌক্তিক সমস্যার সমাধান করতে প্রস্তুত। তবে কেউ যদি নিজের স্বার্থে বাজারব্যবস্থার অপব্যবহার করে বা জনস্বার্থবিরোধী পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করে, তবে সরকার তা মেনে নেবে না।
উল্লেখ্য, ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধসহ কয়েকটি দাবিতে ১৫ ও ১৬ অক্টোবর সারা দেশে এলপিজির দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। গত সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খান এই ঘোষণা দেন। তিনি জানান, দাবি পূরণ না হলে দুই দিনের কর্মসূচির পর আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে।
এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতেই আজ এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠক করে সরকার, যেখানে চলতি সময় ও আগামী বছর এলপিজির সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়।