দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়তে থাকায় লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারির চাহিদা বাড়ছে। আর তাতে এই বাজার ধরতে বিনিয়োগ করেছে দেশের দুই বড় শিল্পগ্রুপ—ওয়ালটন ও প্রাণ–আরএফএল। আগামী মাসে লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারির সেল উৎপাদনে যাচ্ছে ওয়ালটন। আর নভেম্বরে লিথিয়াম–আয়ন সেল আমদানি করে নিজেদের কারখানায় ব্যাটারি প্যাক উৎপাদনে যাবে প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ।
ওয়ালটন গ্রুপের ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ গাজীপুরের চন্দ্রায় লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারির সেল উৎপাদনের কারখানা স্থাপন করেছে। এই কারখানায় বছরে ১ কোটি পিছ ব্যাটারির সেল উৎপাদিত হবে। এসব ব্যাটারি মোটরসাইকেল, খেলনা, রিচার্জেবল লাইট, রিচার্জেবল ফ্যান, ডিজিটাল স্কেল ইত্যাদি পণ্যে ব্যবহৃত হবে। এ প্রকল্পে এখন পর্যন্ত ১১৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ হবিগঞ্জে তাদের শিল্পপার্কে লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারি প্যাকের উৎপাদনের কারখানা করেছে। সেখানে বছরে ৬০ হাজার ব্যাটারি প্যাক উৎপাদিত হবে। এ জন্য ইতিমধ্যে ২৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে সারা দেশে সব ধরনের ব্যাটারির বার্ষিক বাজার প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার। এর মধ্যে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকার লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারির বাজার রয়েছে। তার মানে ব্যাটারির বাজারের সিংহভাগ এখনো লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির দখলে। তবে ধীরে ধীরে লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির জায়গা দখল করবে লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারি, এমনটাই জানালেন এই খাতে বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলো।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইলেকট্রিক বাইক এবং বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ সংরক্ষণের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে আনুমানিক দেড় লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। এ খাতে ব্যবহৃত ব্যাটারির বার্ষিক বাজারমূল্য ১ হাজার ৬০০ কোটি থেকে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে বছরে বৈদ্যুতিক দুই চাকার যানবাহন বা ইলেকট্রিক বাইক বিক্রি হয় ১২ থেকে ১৬ হাজার। এসব ইলেকট্রিক বাইকে ব্যবহৃত ব্যাটারির বার্ষিক বাজারমূল্য ৬৭৫ থেকে ৯০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিদ্যুৎ সংরক্ষণে ব্যবহৃত ব্যাটারির বার্ষিক বাজারমূল্য ৯০০ কোটি টাকা। বর্তমানে এই তিন খাতকে টার্গেট করে বিনিয়োগ করছে আগ্রহী কোম্পানিগুলো।
* সারা দেশে সব ধরনের ব্যাটারির বার্ষিক বাজার প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার। * বর্তমানে ব্যাটারির বাজারের সিংহভাগ লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির দখলে। * লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারির বর্তমান বাজার দুই থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকার।
ওয়ালটন বানাবে ব্যাটারির সেল
ওয়ালটনের কর্মকর্তারা জানান, শিগগিরই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও সৌরবিদ্যুতের স্টোরেজের জন্য বড় আকারের প্রিসমেটিক লিথিয়াম ও সোডিয়াম ব্যাটারির সেলও উৎপাদন করবে ওয়ালটন। এতে ৪০০–৫০০ কোটি টাকা বাড়তি বিনিয়োগ হবে।
ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজের লিথিয়াম আয়ন–ব্যাটারি প্রকল্পের প্রধান ব্যবসা কর্মকর্তা (সিবিও) মাহফুজুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারি সেল উৎপাদনের জন্য স্থাপিত যন্ত্রপাতির কমিশনিং শেষ হয়েছে। চলতি মাসে বা আগামী মাসে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হবে। পাশাপাশি তিন–চার মাসের মধ্যে লিথিয়াম ও সোডিয়াম ব্যাটারির প্যাক লাইন চালু হবে।
মাহফুজুর রহমান আরও বলেন, ‘এই লাইন থেকেই আমরা ইজিবাইক ও মিশুক, টেলিকম ব্যাটারি, আইপিএস ও ইউপিএস, সোলার স্টোরেজ, প্রাইভেট কার, ইলেকট্রিক বাইক, ফর্ক লিফট ইত্যাদির জন্য বড় আকারের ব্যাটারি উৎপাদনে যাব।’
ব্যাটারি প্যাক বানাবে প্রাণ–আরএফএল
হবিগঞ্জে প্রাণ–আরএফএল শিল্পপার্কে আগামী মাসে আমদানি করা সেল দিয়ে লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারির প্যাক উৎপাদনে যাচ্ছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীটি। শুরুতে তারা বিদেশ থেকে লিথিয়াম সেল এবং কিছু বিশেষায়িত ইলেকট্রনিক ও অন্যান্য উপাদান আমদানি করবে। ফলে লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারির প্যাক উৎপাদনে স্থানীয়ভাবে মূল্য সংযোজন হবে প্রায় ২০ শতাংশ। তবে ভবিষ্যতে নিজস্ব উৎপাদন–সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে মূল্য সংযোজন ৭০–৮০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা জানান গ্রুপটির একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ জানায়, প্রাথমিকভাবে ইজিবাইক, মিশুক ও ই–বাইকের জন্য বিভিন্ন ধরনের লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারি তৈরি করবে তারা। নিজস্ব ব্র্যান্ড ব্লেইজের অধীনে এসব ব্যাটারি বাজারজাত করবে গ্রুপটি।
জানতে চাইলে আরএফএল ব্যাটারি ও কেব্লস প্রকল্পের উপমহাব্যবস্থাপক কাজী রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘ভবিষ্যতে সৌরবিদ্যুৎ সংরক্ষণব্যবস্থা, আইপিএস, ইউপিএস, টেলিযোগাযোগ খাতের ব্যাকআপ বিদ্যুৎ–ব্যবস্থা এবং শিল্পকারখানার বিদ্যুৎ সংরক্ষণের জন্যও ব্যাটারি উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।’ এ জন্য আগামী বছর লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনের কারখানা সম্প্রসারণে আরও ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
জানা যায়, প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনের কারখানায় শুরুতে ৩০০ মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। আগামী বছর আরও ৫০০ মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হবে। প্রথমে দেশের বাজারের জন্য লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারি উৎপাদন করলেও ভবিষ্যতে লিথিয়াম আয়রন ফসফেট বা এলএফপি প্রযুক্তির ব্যাটারি রপ্তানি করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
এ বিষয়ে আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আর এন পাল বলেন, দেশে লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারির চাহিদা এত দিন প্রধানত আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়ে আসছিল। বিশেষ করে চীন থেকে তৈরি ব্যাটারি ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানি করা হয়। স্থানীয় উৎপাদন শুরু হলে তৈরি ব্যাটারি আমদানি কমে আসবে। এতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারির সুবিধা কী
লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারি প্রচলিত লেড–অ্যাসিড ব্যাটারির তুলনায় হালকা ও টেকসই। এমনকি লেড–অ্যাসিড ব্যাটারির তুলনায় প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ সময়ে লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারি চার্জ হয়। ফলে এটি বিদ্যুৎ–সাশ্রয়ী। তবে লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারির দাম প্রচলিত লেড–অ্যাসিড ব্যাটারির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে রাস্তায় ব্যাটারিচালিত তিন চাকার রিকশায় চার–পাঁচটি লেড–অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়। খরচ হয় কোম্পানিভেদে ৫০–৬০ হাজার টাকা। এই ব্যাটারিগুলোর মোট ওজন ১৬০ কেজি। এই রিকশা চার্জ দিতে সময় লাগে ১০–১২ ঘণ্টা। একবার ফুল চার্জে রিকশাটি ১০০–১২০ কিলোমিটার চলে। তবে ছয়–সাত মাস পর থেকে ব্যাটারির কর্মক্ষমতা কমতে থাকে। একই রিকশায় একটি লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারি যথেষ্ট। যদিও দাম পড়বে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। সেই ব্যাটারির ওজন হবে ৩৫–৪০ কেজি। এই ব্যাটারি চার্জ দিতে সময় লাগবে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। একবার ফুল চার্জে রিকশাটি ১২০–১৫০ কিলোমিটার চলবে। আড়াই থেকে তিন বছর পর্যন্ত ব্যাটারির কার্যক্ষমতা একই থাকবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, তৈরি অবস্থায় আমদানি হওয়া লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারিতে মোট শুল্ক–কর ৬৪ শতাংশ। সে কারণে লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারির দাম বেশি। তবে দেশে ব্যাটারি প্যাক উৎপাদনে শুল্ক ও কর ২৮ শতাংশ। আবার দেশে উৎপাদিত ব্যাটারির সেলের শুল্ক ও করছাড় আছে। ফলে দেশে তৈরি হলে ভবিষ্যতে লিথিয়াম–আয়ন ব্যাটারির দাম কমবে।