বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে, বহুল ব্যবহৃত হিসাবগুলো এখনো ২০১৮ ও ২০১৯ সালের তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। নদী ও সমুদ্রে কী পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য মিশছে এবং কতটা বর্জ্য ল্যান্ডফিলে বা ময়লার ভাগাড়ে জমা হচ্ছে, সে বিষয়ে হালনাগাদ তথ্যের তীব্র ঘাটতি রয়েছে। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে প্লাস্টিক বর্জ্যের জাতীয় ভিত্তিমূলক তথ্য হালনাগাদ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
আজ মঙ্গলবার ঢাকায় ‘ন্যাশনাল প্লাস্টিক অ্যাকশন পার্টনারশিপ (এনপিএপি) বাংলাদেশ’–এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব বিষয় উঠে এসেছে। প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলা এবং চক্রাকার অর্থনীতিতে (সার্কুলার ইকোনমি) উত্তরণের লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করতে এই বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জানানো হয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, ইউএনডিপি বাংলাদেশ এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের গ্লোবাল প্লাস্টিক অ্যাকশন পার্টনারশিপের যৌথ প্রচেষ্টায় এনপিএপি বাংলাদেশ পরিচালিত হবে। প্লাস্টিকের উৎপাদন, ব্যবহার, বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের (রিসাইক্লিং) সঙ্গে যুক্ত সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষক, নাগরিক সমাজ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় স্থাপন করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেন, ‘প্লাস্টিক দূষণ শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়। এটি নগরের ড্রেনেজ (নিষ্কাশনব্যবস্থা), নদ-নদী, জলাভূমি, উপকূলীয় অঞ্চল, জনস্বাস্থ্য ও প্রতিবেশব্যবস্থার ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে প্লাস্টিক উৎপাদন ও ব্যবহার জীবিকা, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এ সমস্যা মোকাবিলায় প্লাস্টিকের উৎপাদন থেকে শুরু করে ব্যবহার, সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে বিবেচনায় নিতে হবে।’
পরিবেশমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে উৎপাদক, আমদানিকারক এবং ব্র্যান্ডের মালিকদের আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি মনে করেন, এই প্রক্রিয়ায় নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, উন্নত বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের অবকাঠামো এবং স্বচ্ছ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
প্লাস্টিকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমিয়ে আনা, পণ্যের নকশায় উন্নয়ন এবং পুনর্ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে চক্রাকার অর্থনীতির প্রসার ঘটানো সম্ভব বলে তিনি জানান। মন্ত্রী আরও বলেন, এই উদ্যোগের সাফল্য কেবল সভা-সেমিনারের সংখ্যার ওপর নির্ভর করবে না; বরং নীতিমালার বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সম্পদের দক্ষ ব্যবহারের মতো দৃশ্যমান ফলাফলের ভিত্তিতেই এর মূল্যায়ন করতে হবে।
তথ্য হালনাগাদের গুরুত্ব প্রসঙ্গে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানম বলেন, নদী ও সমুদ্রে প্রবেশ করা প্লাস্টিক বর্জ্য এবং ল্যান্ডফিলে পাঠানো বর্জ্যের পরিমাণ সম্পর্কে বহুল ব্যবহৃত বিভিন্ন হিসাব মূলত ২০১৮ ও ২০১৯ সালের তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে প্লাস্টিক বর্জ্যের জাতীয় ভিত্তিমূলক তথ্য হালনাগাদ করাকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে নেওয়া হয়েছে।
তিনি পরিকল্পিত এই জরিপে সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের অংশগ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সরবরাহের আহ্বান জানান। তাঁর মতে, হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে নীতিনির্ধারণ সহজ হবে এবং একই সঙ্গে দেশের প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা ও সংশোধনের একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি হবে।
এদিকে, ৯০ দিনের মধ্যে বাস্তবায়নের রোডম্যাপ তৈরির কথা জানিয়েছেন ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন রড্রিকস। তিনি জানান, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, পৌর কর্তৃপক্ষ ও উন্নয়ন সহযোগীদের নিয়ে একটি বৈঠক আয়োজনে ইউএনডিপি সরকারকে সহায়তা দিতে প্রস্তুত। এছাড়া প্রায় ৯০ দিনের মধ্যে ব্যয়সহ একটি সময়সীমাবদ্ধ বাস্তবায়ন রোডম্যাপ (পথনকশা) তৈরিতে মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতার প্রস্তাব দেন তিনি।
এই রোডম্যাপে কোন পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে, কোন প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পালন করবে, কতটুকু অর্থায়ন প্রয়োজন এবং কোন ধাপে অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে—তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকার কথা রয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ সুলাইমান হায়দার বলেন, প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় দেশে বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা থাকলেও উৎপাদকদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, পরিবেশনীতি-২০১৮ এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা-২০২১–এর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব কাঠামোর আওতায় বর্জ্য হ্রাস, পুনর্ব্যবহার, পুনরুদ্ধার ও পরিশোধনের ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। তবে শুধু নীতিমালা থাকলেই হবে না, এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।