তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি নেত্রী বিপ্লবী ইলা মিত্রের ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী দেশব্যাপী নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে। তাঁর এই মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী মেলার সমাপনী দিনে আজ মঙ্গলবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের রাওতাড়ায় ইলা মিত্রের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। এই শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিপিবির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন এবং ইলা মিত্র মেলা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব রাগিব আহসান মুন্নাসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের পর বেলা তিনটায় রাগিব আহসানের সভাপতিত্বে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মহসীন রেজার সঞ্চালনায় আয়োজিত এই সভায় বক্তব্য রাখেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, নওগাঁ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে খোদা বাবুল, সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য এস এ রশীদ, আমিনুল ফরিদ, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুব্রত রায়, জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্মল চৌধুরী, কৃষক নেতা হাসান আলী এবং শ্রমিকনেতা আলীমুর রেজা রানা প্রমুখ।
সভায় আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, “বৈবাহিক সূত্রে কমিউনিস্ট কৃষক নেতা রমেন মিত্রের সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রামচন্দ্রপুর গ্রামে আসেন ইলা মিত্র। নিপীড়িত সাঁওতালদের আস্থা অর্জনে তিনি সাঁওতালি ভাষা শিখেছিলেন। তেভাগা লড়াই শুরু করার আগে নিজেদের জমিতে তেভাগা কায়েম করেন। গরিব কৃষকদের একজন হয়ে তাঁদের তেভাগা লড়াইকে নিজের লড়াই হিসেবে গ্রহণ করেন। নিষ্ঠুর নিপীড়ন সহ্য করেও তিনি মেহনতি মানুষের লড়াই ছাড়েননি। তিনি নাচোলে ইলা মিত্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। পাশাপাশি ইলা মিত্রের জীবনী ও কৃষকদের সংগ্রাম পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তির দাবি জানান।”
সভাপতির বক্তব্যে রাকসুর সাবেক ভিপি রাগিব আহসান বলেন, “ইলা মিত্র কৃষকের তেভাগার জন্য লড়েছিলেন। আজ তাঁর উত্তরসূরিরা কৃষকের ফসলের লাভজনক দামের জন্য লড়ছেন। তাঁদের আজকের দিনের লড়াইয়ে অনুপ্রেরণার উৎস ইলা মিত্র।”
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে পৃথক কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ইলা মিত্র স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে রাওতাড়ায় সংগ্রহশালার পাশে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সংসদের সভাপতি বিধান সিংয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদান করেন নাচোল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রিয়াংকা দাস। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) নাচোল শাখার উদ্যোগে বেলা সাড়ে ১১টায় নাচোলে একটি শোক র্যালি এবং নাচোল বাসস্ট্যান্ডে পথসমাবেশের আয়োজন করা হয়।
নাচোল ডাকবাংলো মাঠে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী মেলার শেষ দিনে আলোচনা সভার পাশাপাশি ছিল নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী গম্ভীরা গানের পরিবেশনা করা হয়, যা উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে।
চলতি বছর কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত একটি বিশেষ বই এই মেলায় ব্যাপক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ঢাকার ওমর তারেক চৌধুরী ও কলকাতার শুভাশিস মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘শতবর্ষে ইলা মিত্র: অন্য চোখে’ বইটি পাঠকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। বইয়ের সংগ্রহকারীদের মতে, ইলা মিত্র ও নাচোল কৃষক বিদ্রোহ সংক্রান্ত পূর্ব বাংলা ও ভারতের প্রায় অর্ধশত পুরোনো সংবাদের সংকলন এই বইটির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মেলায় আসা ৮৫ বছর বয়সী মো. সাধু, যিনি ইলা মিত্রের বাড়ির পাশের এলাকার বাসিন্দা, তাঁর স্মৃতিচারণ করেন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ইলা মিত্রের স্বামী আমাদের কাছে “হাবু বাবু” নামে পরিচিত ছিলেন। স্বামী-স্ত্রী দুজনই গরিবের বন্ধু ছিলেন। মাইকে ইলা মিত্রের নাম শুইন্যা ভিতরে ঢুকনু। খুবি ভাল্লাগছে।”