চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলায় ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের বিপ্লবী নেত্রী ইলা মিত্রের স্মৃতি স্মরণে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘ইলা মিত্র মেলা’ ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে। মেলার দ্বিতীয় দিন আজ সোমবার গান, নৃত্য এবং আলোচনা সভার মাধ্যমে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়।

নাচোল উপজেলার ডাকবাংলো মাঠে শুরু হওয়া এই মেলার দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচিগুলো বেলা তিনটার দিকে শুরু হয়। অনুষ্ঠানের সূচনা করেন স্থানীয় সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর শিল্পীরা তাদের ঐতিহ্যবাহী বৃন্দ নৃত্যের মাধ্যমে। এরপর নওগাঁ থেকে আসা ওঁরাও সম্প্রদায়ের শিল্পীরা তাদের বিশেষ নৃত্য পরিবেশন করেন। পাশাপাশি বাউল শিল্পীদের গান মেলার আমেজকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

বিকেল চারটার দিকে ইলা মিত্রের জীবন এবং তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা সভা শুরু হয়। স্থানীয় কৃষকনেতা মন্টু মাহাতোর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় অংশ নেন বিশিষ্ট লেখক ও ইলা মিত্র গবেষক ওমর তারেক চৌধুরী, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কন্ট্রোল কমিশনের সদস্য সুজাত আলী, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য রফিকুজ্জামান লায়েক, কৃষক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক আবিদ হোসেন, আদিবাসী ইউনিয়নের সভানেত্রী রেবেকা সরেন, ক্ষেতমজুর নেতা খলিলুর রহমান বাঙালি এবং আখচাষি নেতা আলতাফ হোসেনসহ আরও অনেকে।

অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য প্রদান করেন প্রয়াত মাওবাদী নেতা চারু মজুমদারের পুত্র অভিজিৎ মজুমদার, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, মাওবাদীর (সিপিআইএম) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মীনাক্ষী মুখার্জি এবং সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও কমরেড মণি সিংহের পুত্র দিবালোক সিংহ।

আলোচনা সভায় গবেষক ওমর তারেক চৌধুরী বলেন, “ইলা মিত্রকে স্মরণের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অন্যান্য সহযোদ্ধাকে আমাদের গুরুত্ব দিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা দরকার। বাংলাদেশের কৃষক আন্দোলনের এসব বীর সংগঠক ও কর্মীদের ত্যাগ ও বীরত্বকে স্মৃতি থেকে মুছে যেতে দেওয়া উচিত হবে না। বৃন্দাবন সাহা, আজাহার শেখ, অনিমেষ লাহিড়ীর কথাও মনে রাখতে হবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, “ইলা মিত্রকে ইলা মিত্র হিসেবে গড়ে তোলার মূল কারিগর ছিলেন তাঁর স্বামী কমিউনিস্ট নেতা রমেন মিত্র। তাঁর কথাও আমাদের বলতে হবে।”

প্রয়াত মাওবাদী নেতা চারু মজুমদারের ছেলে অভিজিৎ মজুমদার তাঁর বক্তব্যে বলেন, “ইলা মিত্র কলকাতার মেয়ে হয়ে যেভাবে নাচোলের গরিব কৃষক ও আদিবাসীদের নিয়ে তেভাগার লড়াই করেছিলেন, সে জন্য আজও তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মও তাঁকে স্মরণ করবে।”

সিপিআইএম ও পশ্চিমবঙ্গের তরুণ বামপন্থী নেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জি বলেন, “ইলা মিত্র তাঁর সমগ্র জীবন মেহনতি কৃষক-মজদুরের মুক্তির জন্য নিবেদন করেছিলেন। তিনি উভয় বাংলার মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র।” বর্তমান পরিস্থিতির সাথে তুলনা করে তিনি আরও বলেন, “দুই বছর আগে আপনারা লড়েছিলেন গণতন্ত্রের জন্য। আজ আমরা লড়ছি গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য। ইউরোপে ছাত্ররা লড়ছে শিক্ষার অধিকারের জন্য।”

সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য দিবালোক সিংহ ইলা মিত্রের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা করেন। তিনি বলেন, “ইলা মিত্র নাচোলে তেভাগা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে এ দেশের মেহনতি কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন। দেশের স্বাধীনতার পর ৫৫ বছরেও কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি।”