আদি রংপুর শহর মাহিগঞ্জ গড়ে উঠেছিল ইছামতী নদীর তীরে। তবে বর্তমান যে রংপুর শহর, তা গড়ে উঠেছে ঘাঘট নদের তীরে। জেমস রেনেলের ম্যাপে যে নদীটিকে ঘাঘট হিসেবে দেখানো হয়েছে, বর্তমানে সেটিই শ্যামাসুন্দরী নদী। অতীতে ঘাঘট ছিল অনেক বড় একটি নদ এবং কালক্রমে এটি তিস্তার শাখানদে পরিণত হয়েছিল।
পানি উন্নয়ন বোর্ড তিস্তা নদীর পাড় সুরক্ষার কথা বলে উৎসমুখে বাঁধ দিয়ে ঘাঘটকে তিস্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। লেখক নিজেই সেই স্থানটি পরিদর্শনে গিয়েছেন। নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার শৈলমারী ইউনিয়নের আলসিয়াপাড়া গ্রামেই তিস্তা থেকে ঘাঘটকে বিচ্ছিন্ন করা হয়।
দীর্ঘদিন মাঠপর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতায় লেখক নদীর কিছু বিশেষ আচরণ লক্ষ্য করেছেন, যা এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। প্রথম উদাহরণ হিসেবে তিনি ধরলা নদীর শাখানদী পাঁচগাছির ছড়ার কথা উল্লেখ করেন। এই নদীটি ধরলা থেকে উৎপন্ন হয়ে কুড়িগ্রাম–নাগেশ্বরী সড়কের মধ্যকুমরপুর বাজারের পাশ দিয়ে ১৫ কিলোমিটার প্রবাহিত হতো। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় যাতায়াতের জন্য নদীটি ভরাট করে রাস্তা তৈরি করা হয়।
সেই রাস্তা নির্মাণে নিয়োজিত একজন শ্রমিকের সাথে কথা বলে জানা যায়, “পাঁচগাছির ছড়ায় প্রবল স্রোতে ছিল। ওই সময় অনেক শ্রমিক মিলে মাটি ফেলতেন আর সেই মাটি স্রোতে চলে যেত। পরে বস্তায় ভরে মাটি ফেলে নদীটি মেরে সড়ক তৈরি করা হয়।” স্বাধীনতার পরপরই ঘটেছিল এই ঘটনা। ফলে পাঁচগাছির ছড়া ভাটিতে কোনোমতে টিকে ছিল।
এর প্রায় ৪৫ বছর পর, ২০১৭ সালে কুড়িগ্রামে ভয়াবহ বন্যা হয়। সেই বন্যায় ধরলা নদী থেকে পাঁচগাছির ছড়া পর্যন্ত পুরো এলাকা ভেঙে আবারও নদী সৃষ্টি হয়। সরকার সেখানে একটি সেতু নির্মাণের চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি, কারণ ভরাট হওয়া অংশটি যারা দখল করেছিলেন, তাদের কারণে বাধা সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত মাটি দিয়ে ভরাট করে সেখানে আবারও সড়ক নির্মাণ করা হয়।
ধরলা নদীর আরেকটি শাখানদ হলো খলিসাকুড়ি। কুড়িগ্রামের সদর উপজেলায় কাঁঠালবাড়ি নামক স্থানে এর উৎপত্তিস্থলের নাম নয়ানদী। তীর রক্ষার নামে এই নদীটির মুখ বন্ধ করা হয়েছিল। তবে ২০১৭ সালে বাঁধ ভেঙে খলিসাকুড়ি পুনরায় সচল হয়, যদিও পরবর্তীতে আবারও বাঁধ দিয়ে একে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় খানা নামে একটি ছোট নদী রয়েছে। সেখানে রেললাইন স্থাপনের জন্য আড়াআড়ি মাটি ফেলে প্রবাহ বন্ধ করা হয়েছে। কয়েক বছর আগে ওই স্থানে উজান ও ভাটির প্রবাহ এক হয়ে গিয়েছিল।
২০১৮ সালে তিস্তার একটি অত্যন্ত ভয়ংকর ঘটনা ঘটে। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় মহিপুর তিস্তা সেতুর প্রায় তিন কিলোমিটার উজানে বিনবিনারচর অবস্থিত। অতীতে নদীটি ওই স্থান থেকে উত্তর দিকে প্রবাহিত হতো এবং এর পথ ছিল মহিপুর তিস্তা সেতু থেকে দুই কিলোমিটার উত্তরে সিরাজুল মার্কেটের পাশ দিয়ে। ২০১৮ সালে তিস্তার প্রবল স্রোতে বিনবিনারচর থেকে সিরাজুল মার্কেটের পাশ দিয়ে প্রায় ১৬ কিলোমিটার এলাকা ভেঙে নদীটি পুরোনো পথে প্রবাহিত হয়। পানির স্রোতের সেই শক্তি ছিল ভয়াবহ; বাড়ি, সেতু এবং গাছপালাসহ সবকিছু ভাসিয়ে নিয়েছিল সেই স্রোত।
এখন আসা যাক রংপুর শহর সংলগ্ন ঘাঘটের প্রসঙ্গে। এই নদটি গাইবান্ধা জেলা শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। যদি কোনো এক প্রবল বর্ষায় ঘাঘট নদ পাঁচগাছির ছড়া, খলিসাকুড়ি, খানা কিংবা বিনবিনারচরের তিস্তার মতো ক্ষিপ্র বেগে সচল হয়ে ওঠে, তবে রংপুর কিংবা গাইবান্ধা শহরকে রক্ষা করবে কে? ঘাঘট আগের চেয়ে আরও অনেক বেশি তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
যেহেতু তিস্তার প্রায় সব শাখা-উপনদীর মুখ বন্ধ করা হয়েছে, তাই ঘাঘট সচল হলে তার স্রোত সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠা অসম্ভব কিছু নয়। রংপুর শহরের ক্যান্টনমেন্টসহ অসংখ্য বাড়িঘর ও জীবন যদি ভেসে যায়, তবে কী হবে? নদীসংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা কি এই বিষয়টি একবারও ভেবে দেখেছেন?
বিষয়টি বুঝতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারোয়ার জাহানের সাথে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, এটি মূলত টেকটোনিক প্লেটের গঠনের ওপর নির্ভর করে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সম্ভবত টেকটোনিক প্লেটের কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই ঘাঘটের মুখ বন্ধ করেছে। অধ্যাপক চৌধুরী সারোয়ার জাহান শহরের সর্বনাশের সম্ভাবনাকে অসম্ভব বলে উড়িয়ে দেননি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, রংপুর এবং ভারতের সিকিম অঞ্চলে একই সময়ে বৃষ্টি হলে ঘাঘট পানিতে পরিপূর্ণ থাকে এবং তিস্তার পানি অনেক উঁচু থাকে। এমতাবস্থায় যদি উৎসমুখের বাঁধ ভেঙে ঘাঘট শাখানদ হিসেবে সচল হয়, তবে রংপুর শহরের চরম সর্বনাশ হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
বছর পাঁচেক আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড ঘাঘট নদের প্রয়োজনীয় অংশ খনন করেছিল। নতুন করে সম্পূর্ণ খননের প্রয়োজন ছিল না, তা সত্ত্বেও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে আরেকটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এই নদে নৌপথ চালু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, তবুও কেন এই কাজ করা হচ্ছে তা অস্পষ্ট। হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে তুলনামূলক কম প্রয়োজনীয় কাজ করা হচ্ছে, অথচ রংপুর শহরের নিরাপত্তার কথা ভেবে শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন ছিল। দেশের অপরিকল্পিত প্রকল্পের একটি উদাহরণ এই ঘাঘটের কাজ।
বাংলাদেশ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় যদি তাদের চলমান কাজের সাথে রংপুর শহর রক্ষা বাঁধ অন্তর্ভুক্ত করে, তবে শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত হতে পারে। ইতিমধ্যে রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন-নবী চৌধুরী নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীর কাছে সিটি করপোরেশনের অভ্যন্তরে থাকা ঘাঘট নদের ভাঙনপ্রবণ তীর সংরক্ষণের আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর এই লিখিত আবেদনটি আমলে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। রসিক প্রশাসক যে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ভেবেছেন, তার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানানো প্রয়োজন। পাশাপাশি গাইবান্ধা জেলা শহরের সুরক্ষার কথা ও ভাবতে হবে।
এতদিন যে ভয়াবহ কোনো ঘটনা ঘটেনি, তাকে আশীর্বাদ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়ের মতো পরিস্থিতি হতে পারে। তাই রংপুর সিটি করপোরেশন এবং গাইবান্ধা জেলা শহরের নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে চলমান প্রকল্পে দুই শহরের তীর রক্ষার কাজ যুক্ত করা হোক।
— তুহিন ওয়াদুদ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক।