মেমোরি চিপের তীব্র সংকটের মুখে বিশ্ববাজারে স্মার্টফোনের সরবরাহে বড় ধরনের ধস নেমেছে। বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোন সরবরাহের পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, গত ১৪ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে স্মার্টফোনের সরবরাহ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। মেমোরি চিপের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহের ঘাটতির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় স্মার্টফোনের বাজারে এই সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের প্রতিবেদনে বিস্তারিত বলা হয়েছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে মেমোরি চিপের চাহিদা দ্রুত বেড়েছে। এআই খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে এই চিপগুলোর বিপুল ব্যবহারের ফলে স্মার্টফোন নির্মাতারা সরবরাহে সংকটের মুখে পড়েছেন। এর পাশাপাশি চিপের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নির্মাতাদের স্মার্টফোনের দাম বাড়াতে হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন বিক্রির পরিমাণ বাড়ানোর চেয়ে মুনাফা ধরে রাখাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে উৎপাদন ও সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে।
বিশ্ববাজারে সামগ্রিক সরবরাহ কমলেও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান স্যামসাং সবচেয়ে বেশি স্মার্টফোন তৈরি ও বাজারজাত করেছে। তৃতীয় প্রান্তিকে বিশ্বের স্মার্টফোন বাজারের ২৩ শতাংশ দখলে রেখেছে এই প্রতিষ্ঠানটি। ধারণা করা হচ্ছে, গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড ৮ সিরিজের প্রতি ক্রেতাদের প্রবল আগ্রহ এবং মধ্যম দামের স্মার্টফোনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের স্থিতিশীল সরবরাহ এই সাফল্যের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। তবে গত বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় স্যামসাংয়ের স্মার্টফোন সরবরাহ ৩ শতাংশ কমেছে বলে জানা গেছে।
কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের তথ্যমতে, স্যামসাংয়ের পর বিশ্বের স্মার্টফোন বাজারের ২২ শতাংশ দখলে রয়েছে অ্যাপলের। গত বছর আইফোন ১৭ সিরিজের সব মডেল বাজারে এলেও এ বছর আইফোন ১৮ সিরিজের সাধারণ মডেলটি বাজারে আসেনি। ফলে নতুন আইফোন বাজারে ছাড়ার প্রথম মাসে বিক্রেতাদের কাছে সরবরাহের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় কম ছিল। অন্যদিকে, চীনের স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অপো ও ভিভোর সরবরাহ ২০ শতাংশের বেশি কমেছে। শাওমির ক্ষেত্রে এই ঘাটতি আরও বেশি, যার সরবরাহ কমেছে ৩০ শতাংশের বেশি। মুনাফা ধরে রাখতে শাওমি কম দামের স্মার্টফোনের বাজারে নিজেদের কার্যক্রম সীমিত করেছে এবং পাশাপাশি কয়েকটি বিদেশি বাজারে ব্যবসার পরিসরও কমিয়ে এনেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এই পরিস্থিতি নিয়ে কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক শিলপি জৈন বলেন, “ক্রেতারা ধারণার চেয়ে বেশি সময় পুরোনো স্মার্টফোন ব্যবহার করছেন। তাঁদের অনেকে নতুন ফোন কেনার পরিবর্তে সংস্কার করা ব্যবহৃত ফোনের দিকে ঝুঁকছেন। একই সঙ্গে তুলনামূলক বেশি দামের ও উন্নত সুবিধার স্মার্টফোনের প্রতিও তাঁদের আগ্রহ বাড়ছে।”
চলতি বছরের বাকি সময়েও স্মার্টফোনের বাজারে এই চাপ অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চ। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন কমানো, স্মার্টফোনের মডেলের সংখ্যা সীমিত করা এবং বেশি দামের ফোনের দিকে মনোযোগ বাড়ানোর প্রবণতা সামনেও বজায় থাকতে পারে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারেন কম দামে স্মার্টফোন কিনতে আগ্রহী ক্রেতারা। যন্ত্রাংশের সীমিত সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ফোনের দাম আরও বাড়তে পারে, যা নতুন স্মার্টফোন কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে এবং বাজারে বিক্রি আরও হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।