ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে কাজ পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় অনেক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি মেনে নিয়েছিলেন লিনা হেডি। পরবর্তীতে জনপ্রিয় একটি সিরিজে নগ্ন দৃশ্যের জন্য বডি ডাবল ব্যবহার করায় দর্শকদের তীব্র সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছিল তাঁকে। হলিউডের ক্ষমতার রাজনীতি, নারীর শরীর নিয়ে প্রত্যাশা এবং নিজের সীমারেখা রক্ষার অধিকার নিয়ে সম্প্রতি বিস্তারিত কথা বলেছেন ‘গেম অব থ্রোনস’ তারকা লিনা হেডি।
একজন অভিনেত্রীর মূল কাজ হলো তাঁর চরিত্রটিকে দর্শকদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। সেই চরিত্রের প্রয়োজনে কখনো কাঁদতে হয়, কখনো সহিংসতার মুখোমুখি হতে হয়, আবার কখনো অভিনয় করতে হয় প্রেম কিংবা অন্তরঙ্গ দৃশ্যে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, পর্দায় চরিত্রের প্রয়োজনে নিজের ব্যক্তিগত অস্বস্তি কতটা দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভব? আর যদি কোনো দৃশ্যে অভিনয় করতে রাজি না হন, তবে সেই সিদ্ধান্তের কারণে একজন অভিনেত্রীকে যদি কম পেশাদার হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে তিনি কী করবেন?
হলিউড অভিনেত্রী লিনা হেডির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় এই প্রশ্নগুলো এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় সিরিজ ‘গেম অব থ্রোনস’-এ সার্সি ল্যানিস্টার চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তবে এই সিরিজেরই একটি নগ্ন দৃশ্যে বডি ডাবল ব্যবহার করার সিদ্ধান্তের কারণে তাঁকে দর্শকদের সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। সম্প্রতি নিজের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন এই অভিনেত্রী। তাঁর মতে, তখন কাজ পাওয়ার প্রবল আনন্দে অনেক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেননি।
চলতি বছর ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লিনা হেডি জানান, অভিনয়জীবনের শুরুতে কিছু চরিত্রে চুম্বন, প্রেমের অভিনয়, যৌনদৃশ্য কিংবা নগ্নতার প্রয়োজন হতো। তখন তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল কাজ পাওয়া এবং শুটিং সেটে উপস্থিত থাকার সুযোগ লাভ করা। ফলে কিছু পরিস্থিতি অস্বস্তিকর মনে হলেও সেগুলো নিয়ে তিনি খুব বেশি প্রশ্ন তোলেননি। এখন অতীতের দিকে ফিরে তাকিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন যে, সব অভিজ্ঞতা স্বস্তিদায়ক ছিল না।
অভিনেত্রী জানান, ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে কাজ পাওয়ার আনন্দে তিনি অনেক কিছু মেনে নিতেন। পরে সেই অভিজ্ঞতাগুলো মনে করে তাঁর মনে হয়েছে, পরিস্থিতিগুলো অত্যন্ত কঠিন ছিল। সেই সময়ে নিজের সীমারেখা সম্পর্কে সচেতনতা এবং তা প্রকাশ করার আত্মবিশ্বাস—দুটিই আজকের তুলনায় অনেক কম ছিল।
এইচবিওর ‘গেম অব থ্রোনস’-এর পঞ্চম মৌসুমের শেষ দিকে সার্সি ল্যানিস্টারের একটি দৃশ্য দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। রাজপরিবারের এই নারী চরিত্রটিকে নগ্ন অবস্থায় জনতার সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে বাধ্য করা হয়। চারপাশের মানুষ তাঁকে অপমান করে এবং কটূক্তি করে। দৃশ্যটির মূল উদ্দেশ্য ছিল চরিত্রটির অপমান, অসহায়ত্ব ও মানসিক বিপর্যয় ফুটিয়ে তোলা। তবে পর্দায় এই দৃশ্যটি লিনা নিজে অভিনয় করেননি, বরং বডি ডাবলের মাধ্যমে কাজ চালানো হয়েছে। পরবর্তীতে বিশেষ ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের সাহায্যে দুজনের পারফরম্যান্সকে একত্র করা হয়।
কেন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? হেডি ব্যাখ্যা করে বলেন, তিনি একজন আবেগপ্রবণ অভিনেত্রী এবং চরিত্রের অনুভূতির গভীরে প্রবেশ করেই অভিনয় করতে পছন্দ করেন। কিন্তু কয়েক দিন ধরে বিপুলসংখ্যক অতিরিক্ত শিল্পীর সামনে নগ্ন হয়ে হাঁটার অভিজ্ঞতায় তাঁর মনোযোগ চরিত্রের আবেগ থেকে সরে গিয়ে আত্মরক্ষার দিকে চলে যেতে পারত। এতে সার্সির মানসিক অবস্থাকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ত। এছাড়া তখন তিনি দুই সন্তানের মা ছিলেন। সন্তানদের কাছে তাঁর পরিচিতি ও পারিবারিক বাস্তবতাও এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনায় এসেছিল। তবে বডি ডাবল ব্যবহারের অর্থ এই নয় যে তিনি দৃশ্যটির অভিনয় এড়িয়ে গেছেন। শুটিংয়ের সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন এবং চরিত্রের আবেগ ফুটিয়ে তুলতে কাজ করেছেন।
২০১৬ সালে এল এবং এন্টারটেইনমেন্ট উইকলিতে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারেও তিনি এই বিষয়ে কথা বলেছিলেন। তাঁর আপত্তির জায়গাটি ছিল এই যে, নগ্ন দৃশ্যে নিজে অভিনয় না করায় কেউ কেউ তাঁকে কম দক্ষ অভিনেত্রী হিসেবে গণ্য করেছিলেন।
নগ্ন দৃশ্যের জন্য বডি ডাবল ব্যবহারের খবর প্রকাশের পর কিছু দর্শক ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন এবং এই সিদ্ধান্তকে দর্শকের সঙ্গে প্রতারণা হিসেবে দেখেছিলেন। চলতি বছর দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে কথা বলতে গিয়ে হেডি জানান, দর্শকদের এই ক্ষোভ তাঁকে বিস্মিত করেছিল। সিরিজটির পরিচিতি ও বিপুল দর্শকসংখ্যার মধ্যে তখন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রকাশ্য হয়ে উঠেছিল। এমন পরিস্থিতিতে চরিত্রের আবেগের জন্য প্রয়োজনীয় মনোযোগ ধরে রাখার বিষয়টিও কঠিন হয়ে পড়েছিল।
লিনা হেডির বক্তব্য শুধু অন্তরঙ্গ দৃশ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তিনি হলিউডের ক্ষমতার রাজনীতি নিয়েও সরব হয়েছেন। একই সাক্ষাৎকারে তিনি হলিউডে ক্ষমতাবান পুরুষদের সুরক্ষা দেওয়া এবং কাজের সুযোগের ওপর তাঁদের প্রভাব নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে প্রযোজক হার্ভি ওয়াইনস্টিনের সঙ্গে নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন তিনি। হেডির ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়াইনস্টিনের সঙ্গে একটি ঘটনায় তিনি তাঁর অগ্রহণযোগ্য আচরণের প্রতিবাদ করেছিলেন। এরপর মিরাম্যাক্সের আর কোনো ছবিতে কাজের সুযোগ পাননি তিনি। তাঁর ধারণা, ওই প্রযোজকের ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার না করায় পরবর্তী বহু কাজের সম্ভাবনা তিনি হারিয়েছিলেন।
হেডি বলেন, বিনোদনশিল্পে ক্ষমতাবান পুরুষদের প্রভাব এবং কাজের জন্য মরিয়া তরুণ অভিনেত্রীদের অসহায় অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের অসমতা রয়েছে। একজন তরুণী কাজ পাওয়ার জন্য চেষ্টা করছেন; অন্যদিকে এমন একজন ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁর হাতে কাজ দেওয়ার ক্ষমতা। এই অসম সম্পর্কই অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাকে কঠিন করে তোলে।
২০১৭ সালে #মিটু আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার পর যৌন হয়রানি ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে বিনোদনশিল্পে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। হেডির মতে, ওই আন্দোলন অনেককে বুঝতে সাহায্য করেছিল যে সমস্যাগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ, এখনকার অনেক তরুণ অভিনেত্রী নিজেদের সীমারেখা সম্পর্কে আগের চেয়ে বেশি সচেতন এবং অস্বস্তিকর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে প্রস্তুত।