রাজশাহীর ক্রীড়াঙ্গনে এক নীরব বিপ্লবের নাম বৈকালী সংঘ। আগামী ১৬ ডিসেম্বর এই ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটির প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। ১৯৭৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তী সময়ে রাজশাহীর হকির আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়। সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ক্লাবটির দীর্ঘ পথচলা প্রতিকূলতা জয় করে দেশে হকি খেলাটিকে বাঁচিয়ে রাখার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

বর্তমান সময়ে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে ক্রিকেটের একচ্ছত্র আধিপত্য এবং ফুটবলের প্রবল উত্তেজনা থাকলেও হকি খেলাটি প্রায় মৃতপ্রায়। এক সময়ের হকির সবচেয়ে উর্বর ভূমি ফরিদপুর আজ বিরানভূমি; সেখানে এই খেলার কোনো চর্চা নেই। যশোর ও সিলেটেও হকির চর্চা অনিয়মিত। চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, ঠাকুরগাঁও, নাটোর এবং কক্সবাজারে কিছু নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক খেলাটিকে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। তবে এই সব প্রচেষ্টাকে ছাপিয়ে রাজশাহীর বৈকালী সংঘ সারা দেশে সবচেয়ে বেশি শিশু-কিশোরকে নিয়মিত হকি প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

সম্প্রতি এক পড়ন্ত বিকেলে শহরের কালেক্টরেট মাঠে গেলে শোনা যায় সেই চিরচেনা স্টিক ও বলের ঠুকঠাক শব্দ। মাঠের একপাশে গরু-ছাগলের বিচরণ, আর অন্য পাশে হকি শিখছে ৩০-৩৫ জন শিশু-কিশোর। তাদের বয়স মাত্র ৮ থেকে ১৩-১৪ বছরের মধ্যে। মাঝখানে বয়সে কিছুটা বড় ২০-২৫ জন তরুণ প্র্যাকটিস ম্যাচে ব্যস্ত। আর বাঁশি হাতে পুরো প্রক্রিয়াটি নির্দেশনা দিচ্ছেন জাতীয় দলের সাবেক তারকা খেলোয়াড় আশরাফুল ইসলাম (শিশু)। আর্থিক অনটন এবং অবহেলার মতো নানা সংকট সত্ত্বেও অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তিনি বুনে চলেছেন হকির ভবিষ্যৎ স্বপ্নের বীজ।

রাজশাহী জেলায় ২০১৬ সাল পর্যন্ত মোট ২৪ বার হকি লিগ অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে ২১ বারই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বৈকালী সংঘ। সর্বশেষ চ্যাম্পিয়ন শিরোপাও তাদের হাতেই। গত ১০ বছরে আরও চার-পাঁচটি লিগ অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সব মিলিয়ে ২৩-২৪ বারই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বৈকালী। ২০২৩ সালের পর আর লিগ না হলেও বৈকালীর হকিচর্চা থেমে থাকেনি।

সদ্য সমাপ্ত এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ দলের স্ট্রাইকার ওবায়দুল হোসেন জয় এই ক্লাবেরই সাবেক ছাত্র। এছাড়া সাবেক জাতীয় তারকা কৃষ্ণ কুমার কৃষ্ণা, সাব্বির রানা, মিলন হোসেন এবং বর্তমানের ফজলে রাব্বিরা এখান থেকেই উঠে এসেছেন। গত বছর অনূর্ধ্ব-২১ বিশ্বকাপে খেলা চারজন খেলোয়াড়—মেহেদী হাসান, কনক, সাব্বির ও অমিত বৈকালীর ঘরের ছেলে। অকালপ্রয়াত জাতীয় দলের তারকা রবিউদ্দিন রবি ও শামীম রেজার শিকড়ও ছিল এই বৈকালী সংঘে।

গত ১০ অক্টোবর ঢাকায় শুরু হওয়া প্রথম বিভাগ হকি লিগে বৈকালীর অন্তত ২০ জন খেলোয়াড় বিভিন্ন দলে যুক্ত হয়েছেন। এ বছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে সাভার বিকেএসপি থেকে বের হয়ে এসেছেন রাজশাহীর সাতজন হকি খেলোয়াড়। বর্তমানে সাভার ও দিনাজপুর বিকেএসপিতে রাজশাহীর পাঁচজন করে খেলোয়াড় রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বৈকালীর সদস্য। ক্লাবটির একটি নারী হকি দলও রয়েছে, যারা গত বছর হকি একাডেমি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ আয়োজিত টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়। এছাড়া সদ্য এশিয়ান গেমসে খেলা জাতীয় নারী দলের গোলকিপার মহুয়াও বৈকালীর খেলোয়াড়।

বর্তমানে পাঁচটি গ্রুপে মোট ১২০ জন শিশু-কিশোর ও তরুণ বৈকালীতে নিবন্ধিত আছেন। ক্লাবটির মোট ছয়জন হকি কোচ রয়েছেন। বিকেএসপিতে যেখানে সপ্তম শ্রেণি থেকে খেলোয়াড় নেওয়া হয়, সেখানে বৈকালী ৩য়-৪র্থ শ্রেণির ছেলে-মেয়েদেরও হকি শেখায়। আর এই প্রশিক্ষণের মাসিক বেতন মাত্র ১০০ টাকা!

কালেক্টরেট মাঠ থেকে খুব কাছেই কাজীহাটা মনিবাজারে অবস্থিত বৈকালী সংঘের ক্লাবঘর। সেখানে দেখা গেল ঘরের সংস্কারকাজ চলছে। অর্ধশতাব্দী ধরে হকি ও ক্রিকেটে অর্জিত ট্রফি, শিল্ড এবং সম্মাননা স্মারকগুলো সাময়িকভাবে ঠাঁই পেয়েছে পাশের একটি এসি-ফ্রিজ মেরামতের দোকানে।

ক্লাবঘরের বাইরে একটি প্ল্যাকার্ডে জাতীয় দলের প্রয়াত তারকা ডিফেন্ডার ও পেনাল্টি কর্নার বিশেষজ্ঞ রবিউদ্দিন রবির ছবি শোভা পাচ্ছে। ১৯৯৯ সালে ঢাকায় শারীরিক শিক্ষা কলেজে খেলার সময় মাথায় আঘাত পেয়ে অকালে মারা যান তিনি। ঢাকার মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামের মূল ফটক তাঁর নামেই রাখা হয়েছে। রবির বড় ভাই রায়হানউদ্দিন হালিম বর্তমানে বৈকালীর হকি কোচ। হালিম কাতর কণ্ঠে বলেন, “অনেক কষ্ট করে প্রতিষ্ঠানটা ধরে রেখেছি। অনেক যত্নের সঙ্গে হকি খেলোয়াড় তৈরি করছি।”

তবে বর্ষাকালে জল ও কাদায় কালেক্টরেট মাঠ খেলার অনুপযোগী হয়ে পড়ে, ফলে শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও কমে যায়। গবাদিপশুর বিচরণ তো আছেই, পাশাপাশি বিভিন্ন জনসভা বা মেলার কারণে মাঠটি গর্ত হয়ে নষ্ট হয়। আশরাফুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, “এটা জেলা প্রশাসনের মাঠ। তাদের অনেক অনুরোধ করেছি মাঠ ঠিক করতে। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। ছোট ছোট বাচ্চারা আসে হকি শিখতে, ওদের একটা ভালো মাঠ দিতে পারি না! উঁচু-নিচু-অসমতল মাঠ। এটা অনেক বড় দুঃখ আমাদের।”

এত বাধা সত্ত্বেও বৈকালীর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কালেক্টরেট মাঠে হকি শিখতে আসা ৯ বছরের আরশ বা ১২ বছরের কাজী আইজান পারভেজের চোখে পুরো বাংলাদেশের হকির উজ্জ্বল স্বপ্নটি আলো হয়ে জ্বলে ওঠে। চঞ্চল মুখে একস্বরে তারা বলে ওঠে, “আমরা বড় হয়ে হকি প্লেয়ার হতে চাই!”

শহরের সিপাহীপাড়া হকি ক্লাব এখন ম্রিয়মাণ, যেখান থেকে উঠে এসেছেন জাতীয় দলের ফরহাদ আহমেদ সিটুল। উপশহর, কাজীহাটা, কসমস, হিরোস ও ষষ্ঠীতলার মতো স্থানীয় হকি ক্লাবগুলো যখন কেবল সাইনবোর্ড-সর্বস্ব, বৈকালী সংঘ সগৌরবে টিকে আছে কিছু মানুষের চেষ্টা আর ভালোবাসায়।

বৈকালী সংঘ মূলত একটি সামাজিক সংগঠন। তারা ক্রিকেট খেললেও হকিই তাদের প্রধান পরিচয়। রাজশাহী হকি লিগে ১০টি ক্লাবের মধ্যে বৈকালীর অধীনে তিনটি ক্লাব রয়েছে। বর্তমান সভাপতি মনিরুজ্জামান ছানা প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই সাথে আছেন এবং তিনি নিজেও ছোটদের হকি শেখান। অন্য কর্মকর্তাদের মুখে তাঁর প্রশংসা শোনা যায়। তাঁর আর্থিক সহায়তা ও প্রচেষ্টায় ক্লাবটি টিকে আছে। মনিরুজ্জামানের তৃপ্তি এখানে, “আমাদের বড় সাফল্য জেলার ২৫-৩০ জন ছেলেকে বিভিন্ন বাহিনীতে ভর্তি করতে পেরেছি। অনেক দরিদ্র পরিবারের ছেলের কর্মসংস্থান হয়েছে হকি খেলে।”

একসময় রাজশাহীতে বৈকালীর মিঠু-আইনুল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল, যা এখন কেবলই ইতিহাস। তারা একটি হকি টুর্নামেন্টও আয়োজন করত, সেটিও এখন আর হয় না। এসব গল্প শুনতে শুনতে ক্লাব ভবন থেকে ফেরার সময় সাধারণ সম্পাদক এবং প্রয়াত রবির বড় ভাই রইসউদ্দিন আহমেদের আকুতি কানে বাজল, “একটা অ্যাস্ট্রোটার্ফ যদি আমরা পাই, আরও অনেক হকি খেলোয়াড় তৈরি করতে পারব।”

দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে বর্তমানে অনেক কাজ হচ্ছে। বৈকালী সংঘের জন্য একটি মিনি টার্ফের ব্যবস্থা কি সরকার বা হকি ফেডারেশন করতে পারে না? ৫০ বছর পূর্তির এই মাহেন্দ্রক্ষণে বৈকালী যদি এমন একটি উপহার পায়, তবে রাজশাহীর হকিচর্চা আরও বেগবান হবে তা নিশ্চিত।