মহাবিশ্বের অসীম শূন্যতায় নক্ষত্রের জন্ম ও মৃত্যুর এক অন্তহীন চক্র বিদ্যমান। তবে একটি নক্ষত্রের মৃত্যু মানেই যে সবকিছুর সমাপ্তি, তা সবসময় সঠিক নয়। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এমন এক অদ্ভুত গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন, যা তৈরি হয়েছে একটি মৃত নক্ষত্রের ধ্বংসাবশেষ থেকে। গবেষকদের দাবি, এই গ্রহটির আবিষ্কার মহাবিশ্বে গ্রহ সৃষ্টির প্রচলিত ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বিজ্ঞান সাময়িকী 'নেচার অ্যাস্ট্রোনমি'-তে প্রকাশিত গবেষণার ফলাফল এটিই প্রমাণ করে যে, একটি নক্ষত্রের মৃত্যু মানেই তার সবকিছুর শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
মৃত নক্ষত্রের ছাই থেকে জন্ম নেওয়া এই গ্রহটির নামকরণ করা হয়েছে 'ফিনিক্স প্ল্যানেট'। বিজ্ঞানীরা এইচএস ০২০৯ প্লাস ০৮৩২ নামক একটি হোয়াইট ডোয়ার্ফ বা শ্বেতবামন নক্ষত্রের আলো বিশ্লেষণ করে এই গ্রহটিকে শনাক্ত করতে সক্ষম হন। এই আবিষ্কারের বিষয়ে ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইকের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক বরিস গ্যানসিক বলেন, “এই গ্রহ অন্য কোথাও থেকে আসেনি বা পুরোনো সিস্টেমের কোনো বেঁচে থাকা অংশও নয়। এটি তার মৃত নক্ষত্রের উপাদান দিয়েই তৈরি হয়েছে।”
ইউরোপিয়ান রিসার্চ কাউন্সিলের আর্থিক সহায়তায় ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইকের একদল বিজ্ঞানী বর্তমানে এই গ্রহটির গঠন এবং নক্ষত্র ধ্বংস হওয়ার পর এটি ঠিক কীভাবে তৈরি হলো, তা নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা চালাচ্ছেন। ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইকের বিজ্ঞানী জেমি উইলিয়ামস জানিয়েছেন, “দ্বিতীয় প্রজন্মের এই সব গ্রহ–নক্ষত্রের মৃত্যুর সময় নিক্ষিপ্ত পদার্থ থেকেই তৈরি হয়।” শ্বেতবামন নক্ষত্রের চারপাশে এমন গ্রহের অস্তিত্ব পাওয়া ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। একে এমন একটি গ্রহ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে, যা তার নিজের পূর্বে প্রদক্ষিণ করা মৃত নক্ষত্রের ছাই থেকে পুনর্জন্ম লাভ করেছে। সাধারণত সূর্যের মতো নক্ষত্রগুলোর জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে তারা বিশাল 'রেড জায়ান্ট' বা লাল দানবে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়ায় তারা আশপাশের গ্রহগুলোকে গ্রাস করে ফেলে এবং গ্যাস ও ধূলিকণার এক বিশাল মেঘ মহাকাশে ছড়িয়ে দেয়। এরপর কেন্দ্রের দিকে কেবল একটি ঠান্ডা ও অত্যন্ত ঘন নক্ষত্রের অবশেষ বা শ্বেতবামন রয়ে যায়।
বিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত নক্ষত্রের মৃত্যুর সময় যে পদার্থগুলো নিক্ষিপ্ত হয়, তা মহাশূন্যে হারিয়ে যায়। তবে এই বিশেষ ক্ষেত্রে মহাকর্ষ বল সেই নিক্ষিপ্ত গ্যাস মেঘের একটি অংশকে ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। এর ফলে অবশিষ্ট উপাদানগুলো হোয়াইট ডোয়ার্ফ নক্ষত্রের চারপাশে একটি ঘূর্ণমান চাকতিতে পরিণত হয়, যা নতুন শিলা ও গ্যাস জমা হওয়ার জন্য একটি ধূলিময় আঁতুড়ঘরের মতো কাজ করে। সময়ের পরিক্রমায় সেই ধ্বংসাবশেষ থেকেই একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিতীয় প্রজন্মের গ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। উইসকনসিন-ম্যাডিসন ইউনিভার্সিটির অ্যাস্ট্রোনমি বিভাগের বিজ্ঞানী নিকোলাস স্টোন বলেন, “এই উপাদান বিন্যাস এস-প্রসেস বা ভারী মৌল তৈরি প্রক্রিয়ার একটি সুস্পষ্ট লক্ষণ, যা সাধারণ প্রথম প্রজন্মের কোনো গ্রহের মধ্যে থাকার কথা নয়।”