মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন মাত্র দুই শিল্পী, আর তাঁদের সঙ্গী ছিল একটিমাত্র অ্যাকুস্টিক গিটার। সেই গিটারের সুরের মূর্ছনায় একের পর এক পরিচিত গানের মূর্ছনা ভেসে আসছিল মিলনায়তনে। কখনো শ্রোতারা গানের সাথে গলা মেলাচ্ছিলেন, আবার কখনো নীরব হয়ে শুনছিলেন গানের প্রতিটি কথা। গানের মাঝখানে চলছিল প্রাণবন্ত আড্ডা। এমনই এক অন্তরঙ্গ ও মায়াবী সংগীতসন্ধ্যা উপহার দিলেন কোক স্টুডিও বাংলার জনপ্রিয় কণ্ঠ সানজিদা মাহমুদ নন্দিতা এবং সংগীতশিল্পী শুভেন্দু দাস শুভ।

গত শনিবার সন্ধ্যায় সিডনির ব্রায়ান ব্রাউন থিয়েটারে তাঁদের গান শুনতে ভিড় করেছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। এই বিশেষ আয়োজনের মাধ্যমেই শুরু হলো দুই শিল্পীর যৌথ সংগীত উদ্যোগ ‘মোজি অ্যান্ড কোং’-এর প্রথম আন্তর্জাতিক সফর।

পুরো আয়োজনে ছিল এক অদ্ভুত সারল্য। বড় কোনো বাদ্যযন্ত্রের দল ছিল না, ছিল না কোনো জমকালো মঞ্চসজ্জা। গানই ছিল সেই সন্ধ্যার মূল আকর্ষণ। আয়োজনের ঘরোয়া আবহ শিল্পীদের সঙ্গে শ্রোতাদের মধ্যকার দূরত্ব যেন পুরোপুরি ঘুচিয়ে দিয়েছিল। মিলনায়তনভর্তি দর্শকের সামনে নন্দিতা ও শুভেন্দু একের পর এক গান পরিবেশন করেন। মাঝেমধ্যে তাঁরা শ্রোতাদের সঙ্গে কথা বলে পরিবেশকে আরও সহজ করে তোলেন। পরিচিত গান, স্মৃতিচারণা আর কথোপকথনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে পুরো আসর।

আগের রাতে সিডনিতে বৃষ্টি হয়েছিল। সেই বৃষ্টির আবহকে ধরে রেখে নন্দিতা গেয়ে ওঠেন ‘মেঘলা আকাশ’। এরপর একে একে শোনান বিভিন্ন স্বাদের গান। পরিবেশনার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা কালজয়ী সব গান। পরিচিত সুরগুলোকে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেন এই দুই শিল্পী। কখনো শ্রোতারা তাঁদের সঙ্গে গলা মেলান, কখনো মন দিয়ে শোনেন। আসরের শেষভাগে যখন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি পরিবেশন করা হয়, তখন পুরো মিলনায়তন আবেগঘন হয়ে ওঠে।

এই সুন্দর আসরের মূলে রয়েছে নন্দিতা ও শুভেন্দুর দীর্ঘদিনের সংগীতচর্চা। কোক স্টুডিও বাংলার প্রথম মৌসুমে কাজী নজরুল ইসলামের ‘বুলবুলি’ গানটি গেয়ে আলোচনায় আসেন নন্দিতা। গানটির সংগীতায়োজন করেছিলেন শুভেন্দু। এরপরও তাঁরা একসঙ্গে অনেক কাজ করেছেন। পুরোনো দিনের বাংলা ও হিন্দি গানগুলোকে নতুনভাবে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যাত্রা শুরু করে তাঁদের ‘মোজি অ্যান্ড কোং’। বর্তমানে ফেসবুক ও ইউটিউবে নিয়মিত গান প্রকাশ করে আসছেন তাঁরা।

উল্লেখ্য যে, এই উদ্যোগের একটি গান সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংগীত অঙ্গনেও ব্যাপক নজর কেড়েছে। এ আর রহমানের সংগীতায়োজনে ‘স্বদেশ’ চলচ্চিত্রের ‘সাওয়ারিয়া’ গানটি নিজেদের মতো করে গেয়েছিলেন নন্দিতা ও শুভেন্দু। গত জুলাইয়ে সেই পরিবেশনার ভিডিওটি নিজের ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে শেয়ার করেন স্বয়ং এ আর রহমান। বিষয়টি দুই শিল্পীর জন্য ছিল এক বড় চমক। রহমানের এই স্বীকৃতি তাঁদের আরও ভালো কাজ করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে বলে জানিয়েছিলেন শুভেন্দু। সেই অনলাইন সংগীত উদ্যোগ এবার দেশের বাইরের মঞ্চে পৌঁছেছে। সিডনির আসর নিয়ে নন্দিতা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সিডনির দর্শক এতটা সুর সচেতন ও গানের সঙ্গে মিশে যাবেন, তা আমাদের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে। আমরা যে গানগুলো গাওয়ার কথা ভেবেছিলাম, দর্শকেরা আগে থেকেই সেগুলো শোনার আগ্রহ প্রকাশ করছিলেন। প্রথম আন্তর্জাতিক সফরের প্রথম পরিবেশনা হিসেবে সিডনির এই অভিজ্ঞতা আমাদের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন থাকবে।”

দর্শকদের ভালোবাসায় মুগ্ধ শুভেন্দু দাস শুভও। তিনি বলেন, “দর্শকের এই আন্তরিক ভালোবাসা ও উষ্ণতা অমূল্য। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসে গভীর মনোযোগ দিয়ে গান শুনেছেন। একজন শিল্পীর জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে!”

মূল পরিবেশনার আগে গান শুনিয়েছেন সিডনিপ্রবাসী বাংলাদেশি শিল্পী হিমেল, মাশফিক, মিতুল ও আদিল। তাঁদের পরিবেশনার মাধ্যমেই সন্ধ্যার আয়োজন শুরু হয়। এরপর মঞ্চে আসেন নন্দিতা ও শুভেন্দু। দুই শিল্পীর গানের পাশাপাশি শ্রোতাদের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথন ছিল আসরের অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ। দর্শকদের প্রতিক্রিয়াতেও এই ঘরোয়া আয়োজনের প্রশংসা উঠে এসেছে। অনুষ্ঠান শেষে অনিতা বিশ্বাস বলেন, “কোনো বাড়তি ড্রাম বা অতিরিক্ত বাদ্যযন্ত্রের কোলাহল ছিল না। কেবল একটি গিটারের মিষ্টি সুরে পুরো মিলনায়তনের মানুষ মগ্ন হয়ে গান শুনেছেন। প্রাণ জুড়িয়ে যাওয়ার মতো এমন গানের সন্ধ্যা প্রবাসে খুব কমই হয়।”

সিডনিতে এই অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে ‘বেস্ট অব বেঙ্গল’। আয়োজকদের অন্যতম তানিম মান্নান জানান, গানকে বাণিজ্যিক চাকচিক্য কিংবা চড়া শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি তাঁরা। বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যেখানে শ্রোতারা মন দিয়ে গান শুনবেন এবং শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলবেন। অনেকটা ঘরোয়া গানের আসরের মতোই এটি সাজানো হয়েছিল।

পুরোনো দিনের জনপ্রিয় গান নতুন সংগীতায়োজনে তুলে ধরার পাশাপাশি মৌলিক গান নিয়েও কাজ করছেন নন্দিতা ও শুভেন্দু। এর আগে এক সাক্ষাৎকারে তাঁরা জানিয়েছিলেন, নিজেদের স্বতন্ত্র কোমল সুরের ধরন বজায় রেখেই নতুন গান প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। সিডনির পর এবার মেলবোর্নে গান শোনাবেন এই দুই শিল্পী। আয়োজকেরা জানিয়েছেন, ২৫ অক্টোবর রোববার সেখানে ‘মোজি অ্যান্ড কোং’-এর পরবর্তী পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর দেশে ফিরবেন নন্দিতা ও শুভেন্দু।