বাংলাদেশ থেকে নিয়মিতভাবে পুঁজি পাচার হচ্ছে—এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এর পরিমাণ ঠিক কত, বিগত রাজনৈতিক সরকারের সময়ে এই পাচারের মাত্রা কেমন ছিল কিংবা এর মধ্যে কত অর্থ বাইরে গেছে, তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক থাকতে পারে।
দেশের গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের মাঝে প্রায়ই আলোচনা হয় যে, বিদেশে অর্থ রাখার পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করে অবৈধ লেনদেন, পুঁজি পাচার, রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং মানি লন্ডারিং। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা, দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং আন্তসীমান্ত বাণিজ্যে আন্ডার-ইনভয়েসিং ও ওভার-ইনভয়েসিংয়ের মতো বিষয়গুলোকেও দায়ী করা হয়।
অর্থনীতিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক, সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক ভাষ্যকারসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, এটি একটি অত্যন্ত গুরুতর সমস্যা এবং দ্রুত এর বিহিত করা প্রয়োজন। অনেকের অভিমত, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের আরও সতর্ক হওয়া দরকার। কেউ মনে করেন, দেশে আইনের শাসন ও অর্থনৈতিক সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে এই প্রবণতা হ্রাস পাবে। আবার অনেকের মতে, দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগগুলো আরও জোরদার হলে অবৈধ অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে কাজ করার অভিজ্ঞতার আলোকে আমি নিশ্চিত যে, বিদেশে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের উল্লিখিত অর্থের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি, কিংবা অন্তত সমপরিমাণ আমানত রয়েছে। অনেক বাংলাদেশিরই সিঙ্গাপুর, দুবাই, হংকং, লন্ডন, টরন্টো, জার্সি কিংবা ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার সামর্থ্য রয়েছে।
অন্যান্য অনেক উন্নয়নশীল অর্থনীতির মতো বাংলাদেশেও কালো বা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার বেশ বড়। দুর্বল সুশাসন, জবাবদিহির অভাব, রাজনৈতিক আনুকূল্যে দুর্নীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ে কঠোর বিধিনিষেধের কারণে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির পাশাপাশি একটি বিশাল ছায়া অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। অতীতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পাকিস্তানি আমানতকারীদের সঞ্চয়, ইউরোপীয় ব্যাংকে ভারতীয়দের আমানত, সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে ইন্দোনেশীয় আমানত এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যাংকে আফ্রিকার স্বৈরশাসকদের আমানতের উদাহরণ এর বহু সাক্ষ্য বহন করে।
প্রকৃতপক্ষে, এই প্রবণতার ওপর ভিত্তি করেই বিশ্বব্যাপী ব্যাংকগুলোর ‘প্রাইভেট ব্যাংকিং’ বা ব্যক্তি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ব্যবসা বিকশিত হয়েছে। যেসব ব্যক্তি বা পরিবার পাঁচ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা তার বেশি আমানত রাখেন, ব্যাংকগুলো তাদের বিশেষায়িত সেবা প্রদান করে। ট্রাস্টি সেবা থেকে শুরু করে দেশে-বিদেশে উচ্চমূল্যের সম্পদ ক্রয়, বিরল চিত্রকর্ম সংগ্রহ, বিলাসবহুল ভ্রমণ, বিশ্বকাপ ক্রিকেট বা ফুটবল খেলা দেখা কিংবা উচ্চমার্গীয় থিয়েটারে যাওয়ার সুযোগ—সবই এই সেবার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
সব সময় যে এই সুবিধাগুলো কেবল দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিক কিংবা রাজনৈতিকভাবে দুর্বৃত্তায়িত সামরিক-বেসামরিক আমলারাই পান, তা নয়। আমাদের দেশের কিছু ব্যবসায়ীও এই ধরনের সেবা গ্রহণের সামর্থ্য অর্জন করেছেন। ঢাকা শহরের অভিজাত এলাকার বিয়ে কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে গেলে দেখা যায়, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা অথবা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত পাসপোর্ট বা আবাসিক স্ট্যাটাস ভোগ করছেন।
এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থায় বাংলাদেশি নাগরিকদের নির্বাহী হিসেবে নিয়োগের সংখ্যাও বাড়ছে। তাদের বিশ্বের যেকোনো ব্যাংকে অর্থ সঞ্চয় বা বিদেশে সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তেমন কোনো সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হওয়ার কথা নয়। তবে বাংলাদেশ থেকে কীভাবে এই বৃহৎ আমানতকারীরা বিদেশে অর্থ নিয়ে যান, সে বিষয়ে বিস্তারিত সংবাদ প্রতিবেদন খুব কমই দেখা যায়।
শিক্ষা, ভ্রমণ বা কাজের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বাংলাদেশি বাবা-মায়েরা উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপীয় দূতাবাসগুলোতে অভিবাসী বা অ-অভিবাসী ভিসার জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন। প্রতিবছর সেই লাইনের দৈর্ঘ্য আরও বাড়ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বর্তমানে ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা তার কিছুটা বেশি। আন্তর্দেশীয় অর্থনৈতিক কার্যক্রম এই অর্থনীতির একটি বড় অংশ। ফলে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক লেনদেনের বাধ্যবাধকতা পূরণে অর্থের সহজ প্রবাহ এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে মুনাফা অর্জনের সুযোগ প্রয়োজন।
আমাদের বর্তমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সংগত কারণেই বিদেশে অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। কিন্তু বৈশ্বিক জোগান ব্যবস্থায় গভীর সম্পৃক্ততা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা থেকে মুনাফা অর্জনের জন্য বৃহৎ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে আরও সহায়তা প্রদান করতে হবে।
আমি জানি, দেশের কিছু বড় পণ্য ব্যবসায়ী বৈশ্বিক পণ্য নিলাম বাজারে অংশগ্রহণের জন্য বিদেশি ব্যাংকে রাখা আমানতকে আংশিক জামানত হিসেবে ব্যবহার করছেন। পণ্য স্পটমার্কেটে অংশ নিয়ে ভালো দর পাওয়ার জন্য তাঁদের এই ধরনের ব্যাংকিং সুবিধা প্রয়োজন। বাংলাদেশি ব্যাংকে এলসি খোলার মাধ্যমে সব সময় তাঁরা এসব সুবিধা নিতে পারেন না।
২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত সরকারের সময়ে আর্থিক অপরাধ তদন্ত সহজ করতে দুর্নীতিবিরোধী টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। তাদের সক্ষমতা বাড়াতে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয় এবং সেই প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ হয়েছিল আমার।
সেখানে একটি ঘটনা সামনে আসে, যেখানে কয়েকজন বাংলাদেশি উদ্যোক্তা বিদেশের ব্যাংক হিসাব থেকে বাংলাদেশে অবস্থিত একটি সুপ্রতিষ্ঠিত চা কোম্পানির কয়েকটি বাগান কেনার জন্য ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাঠিয়েছিলেন।
একজন সেনা কর্মকর্তা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “স্যার, এটা কীভাবে ঘটল?” আমি বলেছিলাম, ইউরোপীয় মালিক কিছু ভালো মানের চা-বাগান বিক্রি করছিলেন। বাংলাদেশি ক্রেতাদের আর্থিক সক্ষমতা ও বাগান পরিচালনার দক্ষতা ছিল, কিন্তু স্থানীয়দের কাছে বিক্রিতে বিক্রেতার অনীহা ছিল। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রচলিত বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও এ ধরনের লেনদেন সহজে অনুমোদন করত না।
আমি তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম, তাহলে ইউরোপীয় মালিকের স্থানীয় সম্পত্তি বাংলাদেশি মালিকদের কীভাবে কেনানো যায়? তিনি কিছুক্ষণ নীরব থেকে মন্তব্য করেছিলেন, “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলের আইন ও বিধির ছায়া যেন এখনো রয়ে গেছে।”
আমরা যদি দেশকে এগিয়ে নিতে চাই এবং অর্থনীতির অগ্রগতি কামনা করি, তবে নীতিমালার ধারাবাহিক সংস্কারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোতে কার্যকর পরিবর্তন আনতে হবে। পরিবর্তিত ও পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নীতিমালাকে যুগোপযোগী করতে হবে। ব্যবসায়িক সম্প্রদায়কে সহজতর পথে মুনাফা অর্জনের সুযোগ দিয়ে জাতীয় সম্পদ সৃজনে সম্পৃক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের বৈশ্বিক জোগান ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সাময়িক ওঠানামা থেকে অধিকতর লাভের সুযোগ দিতে হবে।
তবে এর পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় কিংবা সরকারের উচ্চপর্যায়ের পদে থেকে জনকল্যাণকে জলাঞ্জলি দিয়ে অবৈধ অর্থ অর্জনের পথও রুদ্ধ করতে হবে। আন্তর্দেশীয় বাণিজ্য, করপোরেট করহার এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার নীতিমালাকে প্রতিযোগী দেশগুলোর আলোকে যুগোপযোগী ও সহজতর করতে হবে। পুঁজি পাচার কমানোর পথ শেষ পর্যন্ত শুধু কঠোর নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং একটি প্রতিযোগিতামূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার মধ্যেই নিহিত।
—মামুন রশীদ, অর্থনীতি বিশ্লেষক।