চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) চলমান কর্মবিরতি অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। এর পাশাপাশি তাঁরা নতুন করে ‘সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি’ পালনের ঘোষণা দিয়েছেন।
আজ সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি এবং স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের একটি যৌথ সভার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভা শেষ করে বেলা সোয়া তিনটায় তিন সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি’র কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।
তিন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ জানান, নবনিযুক্ত উপাচার্যের ক্যাম্পাসে প্রবেশ এবং এর ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তাঁরা এই ‘সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি’ পালন করবেন। তাঁদের দাবি, পূর্বঘোষিত দাবিগুলো আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতির পাশাপাশি এই অসহযোগ কর্মসূচি চলবে। এছাড়া নতুন উপাচার্যকে তাঁর প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের সহযোগিতা করবেন না তাঁরা।
সংবাদ সম্মেলনে তিন সংগঠনের যৌথ সিদ্ধান্তের কথা বিস্তারিত তুলে ধরেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মো. আহসানউল্লাহ। তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বহিরাগতদের সহায়তায় উপাচার্যের ক্যাম্পাসে উপস্থিতির বিষয়টি আমরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে এর সম্পূর্ণ দায়ভার উপাচার্যকে বহন করতে হবে।’
অধ্যাপক মো. আহসানউল্লাহ আরও বলেন, ‘আমাদের চুয়েট পরিবার উনাকে উপাচার্য হিসেবে মেনে নিচ্ছে না। আজকে সন্ত্রাসীরা আমাদের শিক্ষার্থীদের বাসে হামলা করেছে। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হওয়ায় আমরা শঙ্কিত। আমরা চাই, সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সংকট নিরসন করুক।’
উল্লেখ্য, গত ২১ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চুয়েটের উপাচার্য পদ থেকে অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের পরদিন থেকেই অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে চুয়েট ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করছেন। একই দিন থেকে শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও কর্মবিরতিতে যান, যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ হয়ে গেছে।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের কারণে এতদিন ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারেননি নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। তবে আজ সকালে ছাত্রদল নেতাদের সহায়তায় তিনি উপাচার্য ভবনের তালা ভেঙে নিজ দপ্তরে প্রবেশ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, একটি হাইয়েস মাইক্রোবাসে করে তিনি ক্যাম্পাসে পৌঁছান এবং ফটকে কেবল ‘শিক্ষক’ পরিচয় দিয়ে ভেতরে ঢোকেন। এরপর ছাত্রদল নেতাদের সঙ্গে নিয়ে উপাচার্য ভবনের ফটকের তালা ভেঙে তিনি নিজের দপ্তরে যান।
সকালে উপাচার্য ভবনে গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত চেয়ারে বসে আছেন অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। তাঁর কক্ষে চুয়েট শাখা ছাত্রদল সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান আল সাবিত এবং সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব হোসাইন উপস্থিত ছিলেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান আল সাবিত মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা একসাথেই ভেতরে প্রবেশ করেছি।’
নতুন উপাচার্যের ক্যাম্পাসে আসার খবর পেয়ে সকাল সাড়ে নয়টা থেকে উপাচার্য ভবনের সামনে অবস্থান নেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। তাঁরা দুপুর ১২টার মধ্যে উপাচার্যকে কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আলটিমেটাম দেন। দুপুর ১২টার পর শিক্ষার্থীরা ভবনের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন এবং উপাচার্য ভবনের বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন বলে দাবি করেন।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একজন, যন্ত্রকৌশল বিভাগের ছাত্রী মাহিরা তাজরীন বলেন, ‘উপাচার্য আমাদের দেওয়া তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকেছেন। আমরা আলটিমেটাম দিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি শোনেননি। তাই আমরা আবারও তালা দিয়েছি।’
ফটকে তালা দেওয়ায় ভবনটির ভেতরে উপাচার্যের সঙ্গে আটকা পড়েন ছাত্রদল সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদসহ সংগঠনটির কয়েকজন নেতা-কর্মী। তালাবদ্ধ অবস্থায় মুক্তকণ্ঠকে মুঠোফোনে তিনি বলেন, ‘সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে তাঁরা আন্দোলন করছেন। আজকে সকালেও ফুল নিয়ে আসার সময় আমাদের এক নেতাকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে।’
শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা গেছে, উপাচার্য ক্যাম্পাসে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পর শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব হোসাইন ফুল ও খাবার নিয়ে তাঁর দপ্তরে যাচ্ছিলেন। তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাঁকে বাধা দেন এবং একপর্যায়ে তাঁর কাছ থেকে ফুল ও খাবার নিয়ে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়।