হইচইয়ে নাজিফা তুষি অভিনীত প্রেশার কুকার মুক্তি পেয়েছে গত বৃহস্পতিবার। কদিন আগে দেশের বাইরে থেকে রইদ–এর জন্য সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেলেন। চলছে ঈদের সিনেমার শুটিংয়ের প্রস্তুতি। তুষির ক্যারিয়ারের সেসব গল্পই শোনাচ্ছেন মনজুরুল আলম

একটা সময় ভাবতেও পারেননি, সিনেমার পারিশ্রমিক দিয়ে চলতে পারবেন। অথচ সেই পারিশ্রমিক দিয়েই এখন জীবন ও জীবিকা চালাচ্ছেন তুষি। শুধু কি তা–ই, ক্যারিয়ারে কখনো ভাবেননি হাওয়া, প্রেশার কুকার, রইদ–এর মতো সিনেমায় নাম লেখানো হবে। অথচ এই কাজগুলোই তাঁকে একটু একটু করে বদলে দিচ্ছে। তিনি এখন হয়ে উঠছেন অন্যদের কাছে আদর্শ। ‘একসময় অনেকে আমাকে বলেছিল, হাওয়ার পরে আমি নাকি হাওয়া হয়ে গিয়েছি। আমার কাজ নেই। কিন্তু আমি নীরবে কাজ করে গেছি। ধৈর্য ধরেছি। সেই কাজগুলো এ বছর একসঙ্গে মুক্তি পাবে, এটাও ভাবনার বাইরে ছিল,’ বলেন তুষি।

‘বছরটা বেশি বেশি হয়ে গেল’ বছরের শুরুতেই খবর পান, রটারড্যাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে মনোনীত হয়েছে তাঁদের সিনেমা রইদ। পরেই দুই ঈদে আসে তাঁর দুই সিনেমা প্রেশার কুকার ও রইদ। এর মধ্যে আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ পরিচালিত ওয়েব সিরিজ অ্যানি জার্মানির উৎসব থেকে সুখবর দেয়। এর মধ্যে রায়হান রাফীর আন্ধার সিনেমার প্রচারণা দিয়েও আলোচনায় আসেন তুষি। এখন প্রস্তুতি নিচ্ছেন নতুন সিনেমার। ‘কাজগুলো বলে দেয়, এ বছরটি আপনার?’ এমন প্রশ্নে হেসে তুষি বলেন, ‘আমি যে সব সময় কাজের মধ্যে ডুবে ছিলাম, এ–ই তার প্রমাণ। আমি কখনোই হাওয়া হইনি। আর এ বছর যে এত কিছু পাব, ভাবিনি। এখন সব কাজ পাশাপাশি সময়ে চলে আসায় আমার কাছে মনে হচ্ছে, এ বছরটা বেশি বেশি হয়ে গেছে। আমার রঙিন এ সময় যেন ফুরিয়ে না যায়। মন থেকে চাই, রঙিন সময়টা থেকে যাক। কারণ, নিজেকে আরও এক্সপ্লোর করতে চাই।’

পথচলা এখনো বাকি কোনো পরিকল্পনা না করেই মিডিয়া অঙ্গনে তাঁর এ পথচলা। তিনি জানান, ‘অনেক কিছু করে ফেলব, বিষয়টা তেমন নয়। আমি আমার মতো করেই চলছি। জানিও না এর পরে ক্যারিয়ারে কখন কী হয়। যে কারণে ভালো সময়ে ভালো চরিত্রগুলো করতে চাই।’ গত তিন বছরে একটু একটু করে নিজেকে বদলেছেন, তৈরি করেছেন তুষি। ‘সফলতা তো পেলেন, এখন সবচেয়ে বেশি ভাবায় কী?’ প্রশ্ন করলে, কিছুটা চুপচাপ থেকে ধীরে ধীরে বলতে থাকেন, ‘এখনো অনেক চরিত্র করতে চাই। আমার পথচলা এখনো বাকি রয়ে গেছে। মন থেকে চাই, সুসময়ের মধ্যেই যেন পছন্দের চরিত্রগুলো ধরা দেয়। তাহলে আমার মতো খুশি আর কেউ হবে না। এই সুন্দর জার্নি অটুট থাকুক। তবে একটি বিষয় মাঝেমধ্যে ভাবায়, নারীকেন্দ্রিক চরিত্র। দেখা যায়, আমাদের দেশে বেশির ভাগ সিনেমার গল্পেই প্রধান চরিত্র পুরুষকেন্দ্রিক। সময়ের সঙ্গে হয়তো এটাও একসময় অনেকটাই পরিবর্তন হবে। নারীকেন্দ্রিক চরিত্রগুলো বাড়বে। এ জন্য নারী শিল্পীদেরও যোগ্যতা দিয়ে প্রমাণ করতে হবে।’

এবার নতুন তুষি ‘তুষি কি নাচতে পারেন না, তুষি কেন মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমা করেন না, একই রকম প্যাটার্নে আর কত?’ তাঁকে নিয়ে অনেকের এমন কথা নাকি তুষিরও কানে এসেছে। তাঁদের সেসব প্রশ্নের উত্তর কাজের মধ্যে দিয়েই দিতে চান তুষি। জানান, দীর্ঘ একটা সময় পছন্দের চরিত্র পাননি। নিজেকে ভাঙবেন, এমন চরিত্র ধরা দেয়নি। এখন পছন্দমতো চিত্রনাট্যের কাজ করার সুযোগ হয়েছে। যে কারণে নিজেকে একটি ঘরানার মধ্যে আটকে রাখতে চান না। তিনি জানান, প্রথমবার তাঁকে মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমাতেও দেখা যাবে। এ সিনেমায় নাচ, গান, মারপিট—সবই নাকি থাকতে পারে। এখনই আর বেশি কিছু বলতে চান না। আগামী বছর ঈদুল ফিতরে সিনেমাটি মুক্তি পাবে। তুষি বলেন, ‘রোমান্টিক প্রেমের গল্প খুব বেশি করা হয়নি; থ্রিলার, হররসহ অনেক জনরার গল্পই খুব একটা  করিনি। এবার নিজেকে ভাঙার সুযোগ পেয়েছি। আগামী বছর ভিন্নভাবে পর্দায় আসব। কারণ, এখন বিশ্বব্যাপী সিনেমার গল্প বলার ধরন, উপস্থাপন বদলে গেছে।’

‘আন্ধার’ সরে এল ‘প্রেশার কুকার’ শুরুতে এ সময়টায় আন্ধার মুক্তির কথা ছিল। কিন্তু সিনেমাটি আগামী বছর ২৬ মার্চ মুক্তি পাচ্ছে। অন্যদিকে প্রেশার কুকার হইচইয়ে মুক্তি পেয়েছে। তুষি জানান, সিনেমা হলের পরে ওটিটি থেকে দর্শকের কাছে থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছেন। ‘মুক্তির তালিকা থেকে আন্ধার সরে গেল, এটা কি মন খারাপ করেছে?’ এমন প্রশ্নে তুষি বলেন, ‘প্রযোজকের সিদ্ধান্তে আমি খুবই খুশি। দেখা যায়, এখানে বেশির ভাগ তাড়াহুড়া করে সিনেমার রিলিজ হয়। সাত দিনে সিনেমার পোস্টপ্রোডাকশনের কাজ হয় না। প্রচার, মার্কেটিং, দর্শকের কাছে যাওয়া—এসবের জন্য সময় দরকার হয়। কারণ, প্রযোজক লগ্নি ফেরত না পেলে সিনেমা হবে না। কারণ, একটি সিনেমা মুক্তির জন্য অবশ্যই ভালো সময় দরকার। যে কারণেই খুশি।’

‘আই লাভ ইউ, তুষি আপু’ তুষিকে এখন সিনেমার প্রচারে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে যেতে হয়। কখনো অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দিতে হয়। সেসব আয়োজনে থাকে প্রশ্নোত্তর পর্ব। কদিন আগে একটি আয়োজনে অংশ নেওয়ার সেই অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করলেন তুষি। প্রশ্ন করার জন্য এক শিক্ষার্থীর কাছে গেল মাইক্রোফোন। মেয়েটি কোনো প্রশ্ন না করেই তুষিকে বলেন,‘আই লাভ ইউ, তুষি আপু। আমি আপনার মতো অভিনয়শিল্পী হতে চাই। আমি আপনার কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পাই।’

কিছুটা থেমে তুষি বলেন,‘ক্যারিয়ারে শুরুতে আমার সমসাময়িক সবাই নাটক করে ভালো আছে। তখন আমি নাটক না করে ছুটেছি অজানা এক পথে। এ সিনেমার পথে কে সফল হবে, কার ভাগ্যে কী আছে, বলা কঠিন। সেটাই আমাকে ভাবায়, আমি কোথায় ছিলাম? আজকের মতো এত কিছু হবে, কেউ আমার মতো হতে চাইবে, এসব কল্পনাও করিনি। এখন যে কেউ কেউ বলেন, আমার মতো হতে চান, এটা আমাকেও অনুপ্রেরণা দেয়। মনে হয়, আমার সিদ্ধান্ত সঠিক, আমি ঠিক পথেই আছি। যে কারণে কোনো পুরস্কার আমাকে খুব বেশি ভাবায় না। খুশি হই না, তা নয়, তবে আমি পুরস্কারের জন্য কাজ করি না।’ সব শেষে তুষি বলেন, ‘আমাকে আরও ভালো করতে হবে, চরিত্রের মধ্যে বেঁচে থাকার জন্য আরও পরিশ্রম করতে হবে। যাঁরা আমাকে দিনের পর দিন সমর্থন দিয়েছেন, সেই আমার পরিবার, শুভাকাঙ্ক্ষী—সবার কাছে কৃতজ্ঞতা।’