মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালেদ বিমানবন্দরে গত পাঁচ দিনে চতুর্থবারের মতো হামলা চালানো হয়েছে। এই ধারাবাহিক হামলার মধ্যে গত শনিবারের ঘটনাটি ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী। ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই বাংলাদেশিসহ মোট ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে এই সিরিজ হামলায় নিহতের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ জনে। সৌদি নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী এই নৃশংস হামলার কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি প্রদান করেছে।

গত ৫ অক্টোবর সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর ‘ডন অব ইয়েমেন’ নামক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে কিং খালেদ বিমানবন্দরে এই হামলাগুলোর সূত্রপাত হয়। প্রথম আক্রমণটি ঘটে গত বুধবার, যাতে সুদানের এক নাগরিক প্রাণ হারান। এরপর শুক্রবার পুনরায় হামলা চালানো হয়, যেখানে একজন পাইলটসহ তিন সৌদি নাগরিক নিহত হন। সবশেষ গতকাল রোববার বিমানবন্দরটিতে আবারও হামলা হয়, যাতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।

গত জুলাই মাস থেকে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে উত্তেজনা নতুন করে বৃদ্ধি পায়। লোহিত সাগরে সৌদি আরবের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে হুতিরা কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনের বিভিন্ন নতুন অঞ্চলও দখল করে নেয় এই গোষ্ঠীটি। যদিও পরবর্তীতে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী কিছু এলাকা পুনরায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। গতকালও দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র লড়াই সংঘটিত হয়েছে।

ইয়েমেনি বাহিনীর দেওয়া তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় তারা হুতিদের লক্ষ্য করে প্রায় দুই হাজার হামলা চালিয়েছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধুবাব শহরটি মুক্ত করে এখন বাব আল-মানদেব প্রণালির দিকে অগ্রসর হচ্ছে বাহিনীর সদস্যরা। এছাড়া তাইজ শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের লড়াই অব্যাহত রয়েছে। তবে ইয়েমেনি বাহিনীর এই অগ্রগতির বিষয়ে হুতিদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।

ইয়েমেনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সানা সেন্টারের গবেষক ইয়াসমিন আল এরিয়ানি আল-জাজিরাকে বলেন, “সৌদি আরবের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে হুতিরা। সে জন্য ইয়েমেন ছাড়িয়ে সৌদিতে হামলা বাড়িয়েছে তারা। হুতিদের এই তৎপরতা আরও বাড়তে পারে। গোষ্ঠীটি সৌদি আরবের পাশাপাশি আঞ্চলিক দেশগুলোকে উসকানি দিচ্ছে। এতে সংঘাতের পরিধি বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।”

ইরানপন্থী হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নেয় হুতিরা। এর পরের বছর দেশটিতে হুতিবিরোধী সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি আরব। ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে সাময়িকভাবে সংঘাত থামলেও বর্তমানে হুতি ও সৌদি-সমর্থিত সরকার—উভয় পক্ষই ইয়েমেনের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে।

এই রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে মূল ভুক্তভোগী হয়ে দাঁড়িয়েছেন সাধারণ মানুষ। ইয়েমেনে ইতিমধ্যে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। শনিবার রিয়াদের হামলায় নিহতদের মধ্যে ১২ জনই ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। তাঁদের মধ্যে দুই বাংলাদেশি এবং চারজন সৌদি নাগরিকের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, মিসর ও সুদানের নাগরিক ছিলেন। এছাড়া ওই হামলায় আহত একজন ভারতীয় নাগরিক গতকাল মৃত্যুবরণ করেন।

শনিবারের এই বিমানবন্দর হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি। গতকাল তিনি বলেন, “এই হামলার কড়া জবাব দেওয়া হবে।” তিনি আরও জানান, রিয়াদের পাশাপাশি দাম্মামের কিং ফাহাদ বিমানবন্দরের কাছেও একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এছাড়া দেশটির পূর্বাঞ্চলে একটি ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে সৌদি সরকার।

রিয়াদ বিমানবন্দরে এই হামলা যে শেষ নয়, তা হুতিদের এক সতর্কবার্তার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে গেছে। শনিবারের ঘটনার পর গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও আকাশসীমা ব্যবহারকারী সব উড়োজাহাজ সংস্থা, কর্মী, শ্রমিক ও যাত্রীদের সতর্ক থাকতে হবে। পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনা বাদে বাকি সব বিমানবন্দর এখন তাদের অভিযানের লক্ষ্যবস্তু।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, শনিবার রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় নিহত দুই বাংলাদেশি হলেন বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামের মো. শাহেদ আহম্মেদ এবং কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার বদরপুর গ্রামের মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরি। এ ঘটনায় আহত চার বাংলাদেশি বর্তমানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, এর আগে সৌদি আরবে হুতিদের হামলায় এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছিলেন। আর শনিবার নিহত হয়েছেন দুজন। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে ১৪ জন নিহত হলেন। শামা ওবায়েদ বলেন, “আমরা আশা করব যে এই বিপর্যয় বন্ধ হবে, এই আক্রমণ বন্ধ হবে। এ ধরনের মৃত্যু আসলে মেনে নেওয়া অত্যন্ত কষ্টকর।”

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও রিয়াদের কূটনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটি বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩-এর ওপর আঘাত হানে। সেই সময় সেখানে ইউএস-বাংলা, সৌদিয়া ও রিয়াদ এয়ারের বাংলাদেশি যাত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১৭ জন ম্যারিয়ট হোটেলে, ২৫ জন র‍্যাডিসন হোটেলে এবং ৪০ জন প্রিন্সেস নুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে অবস্থান করছেন।

সৌদি-হুতি সংঘাতের নতুন করে শুরু হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে ইরান যুদ্ধ। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে রাখতে জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান, যার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। এরই মধ্যে বাব আল-মানদেবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হুতিদের তৎপরতা জ্বালানি বাজারকে আরও চাপের মুখে ফেলেছে।

সংঘাত শুরুর পর মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছিল রিয়াদ। তবে মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করে হুতিরাও তাদের অনুরোধ জানিয়েছিল। পরবর্তীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ওয়াশিংটন এই সংঘাতে সরাসরি সামরিকভাবে জড়াবে না, তবে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে পরোক্ষভাবে রিয়াদের পাশে থাকবে।

তবে রিয়াদ বিমানবন্দরের শনিবারের হামলাকে ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প। তিনি আগের অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়ে গতকাল হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের হামলায় যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও সৌদি আরবে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে এ ধরনের হামলা মেনে নেওয়ার মতো নয়, তা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। এছাড়া ভারত, পাকিস্তান, মিসর, কাতার, জর্ডান, ওমান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, জাপান ও কানাডাও নিন্দা প্রকাশ করেছে।

পাকিস্তান সৌদি আরবের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক্স পোস্টে বলেছেন, সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা রক্ষায় তাঁর দেশ অঙ্গীকারবদ্ধ। উল্লেখ্য, গত আগস্টে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার ফলে যেকোনো সদস্যদেশ আক্রান্ত হলে অন্যরা প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসবে।

তবে এই নিন্দা ও আশ্বাস যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক ডানিয়া থাফের। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, “সৌদি ও হুতিদের মধ্যে যাতে পূর্ণমাত্রায় সংঘাত না শুরু হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, এ লড়াই আর কেবল পাল্টাপাল্টি হামলায় সীমাবদ্ধ থাকছে না।”