ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর তাইজে সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনী এবং ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছে। দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম এই শহরটি এডেনের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের লড়াই চরম আকার ধারণ করেছে। একই সময়ে বাব আল-মানদেব প্রণালির সংলগ্ন এলাকাগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে উভয় পক্ষ। সম্প্রতি হুতিরা মোখ বন্দর নগরীটি নিজেদের দখলে নিয়েছে, যা এই লড়াইয়ের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সরকারি বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, তাইজের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় তাদের সেনারা সফলভাবে অগ্রসর হয়েছে। তবে হুতিরাও দমে যাওয়ার পাত্র নয়; তারা নতুন করে গ্রামীণ এলাকাগুলোতে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে তাইজের আল-শামায়াতাইন, আল-মাআফের এবং দক্ষিণ ও পশ্চিমের গ্রামীণ অঞ্চলগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধ চলছে। বেশ কয়েক বছর ধরে তুলনামূলক শান্ত থাকা কিছু এলাকায়ও হুতিরা পুনরায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। মূলত নতুন সরবরাহপথ চালু করাই তাদের এই প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য, কারণ আল-কাদাহা ও আল-ওয়াজিইয়ার দিকে তাদের যোগাযোগ পথগুলো সরকারি বাহিনী বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।
অন্যদিকে, সরকারি বাহিনী আল-ওয়াজিইয়া এবং বাব আল-মানদেবমুখী কাহবুব পাহাড়ের দিকে তাদের অবস্থান শক্ত করছে। লড়াই এখন পশ্চিম দিকেও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে হুতিরা আল-ধাবাবের দিকে এগোতে চাইছে। এই এলাকাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকে এডেন-তাইজ সড়ক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সাধারণ বেসামরিক মানুষ, ব্যবসায়ী এবং ত্রাণবাহী যানবাহনের চলাচলের জন্য এই সড়কটি জীবনরেখার মতো কাজ করে।
সরকারি বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সম্প্রতি শুরু হওয়া ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযানের আওতায় তারা ২ হাজার ১০৩টি লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করেছে। এই অভিযানে ১ হাজার ৮৬০ জন হুতি যোদ্ধা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
গত মাসে লোহিত সাগরের উপকূলীয় কিছু অংশ এবং বাব আল-মানদেবের নিকটবর্তী এলাকা দখল করে নেয় হুতিরা। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে গত রোববার ইয়েমেনের প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমি হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো পুনর্দখলের লক্ষ্যে নতুন অভিযানের ঘোষণা দিয়েছেন।
এদিকে, গতকাল বৃহস্পতিবার আল-জাজিরার লাইভ আপডেটে ইয়েমেনের লোহিত সাগরের তীরবর্তী হোদেইদা বিমানবন্দরের কাছে একটি বিস্ফোরণের খবর জানানো হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমটি এই তথ্য দিলেও বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ বা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার দাবি করেছে হুতিরা, যার ফলে সেখানে উড়োজাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। এর আগে রিয়াদ ও আবহার বিমানবন্দরে পৃথক হামলায় তিনজন বিদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। সৌদি আরবের সামরিক ঘাঁটি, বিমানবন্দর এবং জ্বালানি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ক্রমাগত হামলা চালাচ্ছে হুতিরা। সম্প্রতি তারা সৌদি আকাশসীমাকে ‘অনিরাপদ’ ঘোষণা করে উড়োজাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোকে সতর্কবার্তা দিয়েছে।
নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুসতাই আল-জাজিরাকে বলেন, “সৌদি আকাশসীমাকে অনিরাপদ ঘোষণা করা হুতিদের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।” তাঁর মতে, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা সীমিত হলেও হুতিদের কাছে সীমান্তের কাছাকাছি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে।
এদিকে, ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে প্রতিবেশী দেশ সিরিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা এবং সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি আরবের অনুরোধে সিরিয়া প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা প্রদান করতে পারে। এই সহায়তার মধ্যে সৌদি আরবকে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে রক্ষা করা অথবা সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।