ঢাকার আশুলিয়ায় একটি প্রস্তাবিত মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের নির্ধারিত জমিতে কাঁচামালের আড়ত নির্মাণ করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি ঘটনা। স্থানীয় বাসিন্দারা আশা করেছিলেন যে এই স্থানে একটি আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে উঠবে, যা এলাকার স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, সেখানে সীমানাপ্রাচীর ভেঙে দোকান নির্মাণ করা হচ্ছে এবং দোকান বরাদ্দের বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। জমি ভাড়া দেওয়ার আড়ালে এই পুরো কার্যক্রমের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব এবং পারস্পরিক সুবিধা ভাগাভাগির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

প্রাপ্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১৬৪ শতাংশ জমি ২০১০ সালে প্রস্তাবিত উত্তরা বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নামে হস্তান্তর করা হয়েছিল। ভূমি কার্যালয়ের সরকারি রেকর্ডেও জমিটি এখনো ওই প্রতিষ্ঠানের নামেই নিবন্ধিত রয়েছে। এমতাবস্থায় প্রশ্ন ওঠে, স্কুলের গভর্নিং বডি কোন আইনি কর্তৃত্বের ভিত্তিতে এই জমি ভাড়া দিল? মাসে ১৬ লাখ টাকা ভাড়ার যে চুক্তি করা হয়েছে, তা কার সঙ্গে, কী শর্তে এবং কত সময়ের জন্য করা হয়েছে? এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর যথাযথ উত্তর না দেওয়া পর্যন্ত ‘স্কুলের ভালোর জন্য’ জমি ভাড়া দেওয়ার দাবিটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এই পুরো অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন স্কুলের গভর্নিং বডির সভাপতি ও বিএনপি নেতা মোস্তফা জামান এবং তাঁর অনুসারীরা। এমনকি নির্মাণপ্রতিষ্ঠানের পরিচালক নিজেই এই কাজটিকে ‘রাজনৈতিক কাজ’ বলে অভিহিত করেছেন এবং সবাইকে নিয়ে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। স্থানীয় বিএনপি নেতার প্রকাশ্য আহ্বান এবং নির্মাণস্থলে দলীয় নেতা-কর্মীদের সক্রিয় উপস্থিতি এই পুরো প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে সম্পদের নিয়ন্ত্রণ বদলে যেতে পারে, কিন্তু এর ফলে যদি জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে সেই বাস্তবতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আওয়ামী লীগ আমলে অনুমোদনের সুবিধার জন্য হাসপাতালের নামের সাথে বঙ্গবন্ধুকে যুক্ত করার যে দাবি সামনে এসেছে, সেটিও একটি নেতিবাচক উদাহরণ হিসেবে গণ্য হয়। তবে পূর্ববর্তী রাজনৈতিক প্রভাব বর্তমানের এই দখলদারি বা অনিয়মকে কোনোভাবেই বৈধতা দিতে পারে না।

এর আগে এই জমিতে ট্রাকস্ট্যান্ড বসানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে একজন বিএনপি নেতা নিজেই স্বীকার করেছেন। ব্যাপক সমালোচনার মুখে সেই পরিকল্পনা সরিয়ে নেওয়া হলেও এখন সেখানে আড়ত নির্মাণ শুরু হয়েছে। ফলে এই ঘটনাটিকে কোনো বিচ্ছিন্ন তৎপরতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এছাড়া একটি গুরুতর অভিযোগ উঠেছে যে, অধ্যক্ষকে জমি ভাড়ায় সম্মতি দেওয়ার শর্তে পুনরায় কর্মস্থলে ফিরতে হয়েছে। এই অভিযোগটি যদি সত্য হয়, তবে তা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্বাধীনতা ও পরিবেশকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

প্রশাসনের উচিত অবিলম্বে এই জমির দলিল, হস্তান্তরের শর্তাবলি, ভাড়ার দরপত্র এবং চুক্তিনামা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা। যথাযথ কর্তৃত্ব ও বৈধতা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত নির্মাণ কাজ এবং দোকান বরাদ্দ প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা প্রয়োজন। ভাড়ার অর্থ কোথায় জমা হচ্ছে, প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা এবং প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো স্বার্থের সংঘাত ঘটেছে কি না, তা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। যদি কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়, তবে অবিলম্বে চুক্তি বাতিল করতে হবে। সরকারের প্রতি আমাদের জোরালো আহ্বান, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে এই দখলদারির অভিযোগটি দ্রুত খতিয়ে দেখুন এবং এর সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।