ঢাকার আশুলিয়ায় একটি প্রস্তাবিত বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের জমিতে বর্তমানে কাঁচামালের আড়ত তৈরি করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভাড়ার আড়ালে জমিটি স্থায়ীভাবে দখল করার চেষ্টা চলছে। তাঁদের দাবি, এখানে আড়ত নির্মাণের অর্থ হলো ওই স্থানে আর কখনোই মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হবে না।

যে জমিতে এই আড়ত নির্মাণ করা হচ্ছে, তা মূলত কামারপার স্কুল অ্যান্ড কলেজের মালিকানাধীন ছিল। স্থানীয় সূত্র ও নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১০ সালে বিদ্যালয়ের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা কমিটি তাদের জমি থেকে ১৬৪ শতাংশ জায়গা একটি মেডিক্যাল কলেজের জন্য বরাদ্দ দেয়। প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানটির নাম রাখা হয়েছিল ‘উত্তরা বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল’।

স্থানীয়দের মতে, তৎকালীন সময়ে আওয়ামী লীগের প্রভাব ছিল প্রবল। সেই প্রভাব খাটিয়েই হাসপাতালের নামে বঙ্গবন্ধুর নাম যুক্ত করে অনুমোদন নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ নেতারা এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ায় বর্তমানে বিএনপির নেতা-কর্মীরা পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন। অভিযোগ উঠেছে, তাঁদেরই ব্যক্তিগত স্বার্থে এখন সেখানে আড়ত নির্মাণ করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ১৯৭৭ সালে হরিরামপুর সাংস্কৃতিক সংসদ নামক একটি ক্লাবের উদ্যোগে কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে ওই ক্লাবের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও কয়েকজন সদস্য এখনো জীবিত আছেন। তবে তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে রাজি হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সদস্য বলেন, “এলাকায় ভালো চিকিৎসাকেন্দ্র নেই। এ জন্য স্কুলের জমিতে হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগ আমলে প্রস্তাবিত হাসপাতালে বঙ্গবন্ধুর নাম বসানো হয়েছিল অনুমোদন পাওয়ার স্বার্থে। এখন বিএনপি এসে হাসপাতালের জমিই দখলে নিয়েছে।”

প্রস্তাবিত হাসপাতালের এই জমিটি রাজধানীর তুরাগ থানার কামারপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে আশুলিয়ার দিকে যাওয়ার পথে রাস্তার ডান পাশে অবস্থিত। গত ৪ অক্টোবর সেখানে দেখা যায়, হাসপাতালের জমিতে জোরেশোরে কাঁচামালের আড়ত নির্মাণের কাজ চলছে। আড়ত তৈরির জন্য সীমানাপ্রাচীরের একটি বড় অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং দেয়ালে ব্যানার টাঙানো হয়েছে। ব্যানারে লেখা ছিল, ‘কাঁচামালের আড়ত, দোকান বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।’

জমিতে বাঁশ ও টিন দিয়ে আড়তের ঘর তৈরি করা হচ্ছে এবং প্রায় অর্ধশত শ্রমিক সেখানে কাজ করছিলেন। তবে নির্মাণকাজ কারা করাচ্ছেন সে বিষয়ে শ্রমিকেরা কথা বলতে রাজি হননি।

গত ৮ অক্টোবর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মুক্তকণ্ঠর ফটোসাংবাদিক সাজিদ হোসেন যখন হাসপাতালের জমিতে সবজির আড়তের ছবি তুলতে যান, তখন তিনি এক ভয়াবহ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। তিনি দেখেন, পাঁচজন মিলে এক ব্যক্তিকে মারধর করছেন। মারধরের শিকার ওই ব্যক্তিকে হুমকি দিয়ে বলা হচ্ছিল, “এই কামে আর কথা কইলেই তোরে মাইরা ফালামু।”

সাজিদ হোসেন যখন কিছুটা দূরে গিয়ে ড্রোনের সাহায্যে ছবি তোলা শুরু করেন, তখন আড়ত নির্মাণের তদারকিতে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর দিকে তেড়ে আসেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনি দ্রুত মোটরসাইকেল নিয়ে এলাকা ত্যাগ করেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, স্কুলের নিয়ন্ত্রণ বর্তমানে মোস্তফা জামানের হাতে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি জমিটি ভাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন এবং তাঁরই অনুসারীরা তা ভাড়া নিয়েছেন, যার ফলে উভয় পক্ষই লাভবান হচ্ছে। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মোস্তফা জামান জানান, বিস্তারিত কথা বলবেন কলেজের অধ্যক্ষ। তবে তাঁর সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ফোন কলটি কেটে দেন।

অন্যদিকে, কলেজের অধ্যক্ষ খুরশীদ জাহান জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত ছিলেন। সূত্রমতে, জমি ভাড়া দেওয়ার বিষয়ে সম্মতির শর্তেই তিনি পুনরায় কলেজে ফিরতে পেরেছেন। হাসপাতালের পরিবর্তে আড়তের জন্য জমি ভাড়া দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্কুলের ভালোর জন্য তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

দখলের এই চেষ্টা আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তুরাগ থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জহিরুল ইসলাম ওই জমিতে ট্রাকস্ট্যান্ড বসিয়েছিলেন। জহিরুল দাবি করেন, তিনি একা এটি করেননি এবং সেখানে আরও একটি পক্ষ ছিল। তিনি বলেন, “আমি তিন মাস স্ট্যান্ড রেখেছিলাম। তখন কামারপাড়া স্কুলকেও টাকা দিয়েছি।”

পরবর্তীতে সমালোচনার মুখে ট্রাকস্ট্যান্ড সরিয়ে নিতে বাধ্য হন জহিরুল। বর্তমানে ‘রফিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান আড়ত নির্মাণের কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক রফিকুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে জানান, তিনি মাঠটি ভাড়া নিয়ে কাজ করছেন এবং মাসিক ভাড়া ১৬ লাখ টাকা।

তুরাগ থানা বিএনপির নেতা জহিরুল ইসলাম মূলত ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্যসচিব মোস্তফা জামানের অনুসারী। উল্লেখ্য, সম্প্রতি মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার পর বিএনপি এই কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রফিক কনস্ট্রাকশন জমি ভাড়া নিলেও এটি মূলত একটি রাজনৈতিক সমঝোতা, যার নেপথ্যে রয়েছেন জহিরুল ইসলাম। রফিকুল ইসলাম স্বীকার করেন, “এটা তো রাজনৈতিক কাজ। তাই সবাইরে নিয়েই কাজ করতে হইব।”

গত ২৬ সেপ্টেম্বর ফেসবুক লাইভে তুরাগ থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক পরিচয় দিয়ে বিপ্লব হোসেন এক ভিডিওতে অন্য নেতা-কর্মীদের এই কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। ভিডিওতে বিপ্লব বলছিলেন, “তুরাগ থানা বিএনপি নেতৃবৃন্দ যারা যাঁরা আছেন, সবাই চলে আসবেন। সবাই মিলে থাকব আমরা, কাজ করব সবাই মিলে।” ওই ভিডিওতে জহিরুলসহ অন্তত ২০ জন নেতা-কর্মীকে দেখা যায়।

তবে এই জমি ভাড়ার বৈধতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। মিরপুর রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. বায়েজিদ সরদার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আমাদের রেকর্ড অনুযায়ী জায়গাটি এখনো উত্তরা বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের নামে রয়েছে; কিন্তু দখলে কারা রয়েছে সে বিষয়টি আমরা বলতে পারব না।”

হরিরামপুর সাংস্কৃতিক সংসদের সদস্যরা দাবি করেছেন, পুরো প্রক্রিয়াটি বেআইনি এবং ক্ষমতার জোরে করা হয়েছে। তাঁদের মতে, এই জমির বাজারমূল্য অন্তত ১০০ কোটি টাকা এবং আড়ত প্রতিষ্ঠার নাম করে মূলত জমিটি দখল করা হয়েছে।

৪ অক্টোবর দুপুরে ওই মাঠের পাশ দিয়ে যাওয়া মুকুল আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এখানে হাসপাতাল হবে জানতাম। হাসপাতাল হলে আমাদের জন্য উপকার হতো। এখন আর মনে হয় হাসপাতাল হবে না।”