মসজিদে প্রবেশ করে আমরা যখন কোরআন শরিফের কোনো মুদ্রিত কপি হাতে নিতে চাই, তখন আলমারির তাকে বিভিন্ন আকার ও রূপের কোরআন দেখতে পাই। সাধারণত পাঠক যে লিপিতে পড়তে অভ্যস্ত, তিনি সেই অনুলিপিটিই বেছে নেন। তবে অনেকের মনেই কৌতূহল জাগে যে, কোরআনের এত রকমের অনুলিপি কেন থাকে এবং এই সংস্করণগুলোর মধ্যে মূল পার্থক্যগুলো আসলে কোথায়?
বিশ্বজুড়ে কোরআনের ছাপা অনুলিপির একাধিক রূপ প্রচলিত রয়েছে। আমাদের সমাজে মূলত দুটি অনুলিপি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়—একটি হলো সৌদি আরবের মদিনা থেকে প্রকাশিত ‘মদিনা মুসহাফ’ এবং অন্যটি হলো বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে বহুল প্রচারিত ‘দক্ষিণ এশীয় মুসহাফ’। বাহ্যিকভাবে সামান্য আলাদা মনে হলেও, এই দুটি অনুলিপিই মূলত ‘হাফ্স’ পাঠরীতিতে মুদ্রিত।
লিপিশৈলীর ভিন্নতা: ‘নাস্খ’ বনাম ‘নাস্তালিক’
অনুলিপিগুলোর দিকে তাকালে প্রথম যে পার্থক্যটি চোখে পড়ে, তা হলো এদের লিপিশৈলী। ইতিহাসে কোরআন অনুলেখনের জন্য বিভিন্ন সময়ে একাধিক লিপিশৈলী ব্যবহৃত হয়েছে। শুরুর দিকে হিজাজি বা কুফি লিপিতে কোরআন লেখা হতো। পরবর্তীকালে আরবি ক্যালিগ্রাফির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বহু বর্ণমালাশৈলী গড়ে ওঠে।
বর্তমানে সৌদি আরবের মদিনা থেকে ছাপা অনুলিপিটি লেখা হয় সুষম ও প্রচলিত ‘নাস্খ’ লিপিশৈলীতে। অপরদিকে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত অনুলিপিটি লেখা হয় ‘নাস্তালিক’ লিপিতে, যা তুলনামূলকভাবে কিছুটা বাঁকানো ও ঝুলন্ত বর্ণমালার ন্যায় দেখায়। (মুফতি মুহাম্মদ ওমর ইসমাইল, তাশহিলুর রুসুম, পৃষ্ঠা ১২, দারুল হুদা, করাচি, ২০০৮)
দুটি শৈলীই আরবি লিপিশৈলীর অন্তর্ভুক্ত এবং উভয় শৈলীতেই কোরআন লেখা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গৃহীত ও সমাদৃত হয়ে আসছে।
রসম আল-খাত্ত: ওসমানি লিপিকাঠামো
লিপিশৈলী আলাদা হতে পারলেও কোরআনের শব্দের মৌলিক বর্ণবিন্যাস বা মূল কঙ্কাল কাঠামো পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ নেই। কোরআনের এই বিশেষ প্রাচীন বানানরীতিকে বলা হয় ‘রসম আল-খাত্ত’ বা ‘রসম ওসমানি’।
নবীজির উপস্থিতিতে সাহাবিরা যেভাবে কোরআনের বাণী লিখে রেখেছিলেন এবং পরবর্তীকালে খলিফা ওসমানের শাসনামলে যে প্রাতিষ্ঠানিক অনুলিপি তৈরি করা হয়েছিল, সেই মৌলিক কাঠামোর প্রতি বিশ্বস্ত থাকাই হলো রসম-শাস্ত্রের মূলনীতি। (আবু আমর আদ-দানি, আল-মুকনি ফি মারিফাতি মারাসিমি মাসাহিফিল আমসার, ১/২৭, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮৬)
ওসমানি যুগে যখন বর্ণমালায় নুকতা বা হরকত (জের, জবর, পেশ) ছিল না, তখন মূল শব্দের রূপটি এমনভাবে রাখা হয়েছিল যেন তা অনুমোদিত বৈচিত্র্যময় পাঠরীতিকে ধারণ করতে পারে। সাহাবিদের প্রস্তুত করা সেই মূল অনুলিপিগুলো পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তীকালে প্রাচীন আলেমগণ সুনির্দিষ্ট বানানরীতি লিপিবদ্ধ করেছেন। যেসব জায়গায় দুটি বিকল্প রূপই সাহাবিদের আমল থেকে নির্ভরযোগ্য সনদে প্রমাণিত, সেগুলোকে বলা হয় ‘খুলফ’।
আধুনিককালে যখন মুদ্রণযন্ত্রের মাধ্যমে কোরআন ছাপা শুরু হয়, তখন আলেমদের বোর্ড প্রাচীন কোনো নির্ভরযোগ্য ইমামের পছন্দকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন। মদিনা থেকে প্রকাশিত অনুলিপিতে ইমাম আবু দাউদ সোলাইমান ইবনে নাজাহর (মৃ. ৪৯৬ হি.) মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। (ইবনে নাজাহ, আত-তাবয়িন লি-হিজাই আল-কিতাবিল মুবিন, ২/৩১০, দারুল কিবলা, জেদ্দা, ১৯৯৮)
অপরদিকে দক্ষিণ এশিয়ার অনুলিপিতে ইমাম আবুল কাসিম আশ-শাতিবির (মৃ. ৫ ৯০ হি.) মতামত অনুসরণ করা হয়েছে। (আশ-শাতিবি, আকিলাতু ইতরাফিল আলফাফ, পৃষ্ঠা ৪৫, দারুল সাহাবা, তানতা, ১৯৯২)
যেমন সুরা নিসার ৭৮ নম্বর আয়াতে ‘আইনা মা’ শব্দ দুটি আলাদা নাকি যুক্ত লেখা হবে—এ নিয়ে দুই ইমামের পছন্দের ভিন্নতার কারণে দুটি অনুলিপিতে দৃশ্যমান বানানে সামান্য পার্থক্য দেখা যায়।
নুকতা ও হরকতের নিয়ম
রসম বা মূল অক্ষরের পর আসে বর্ণমালার নুকতা ও হরকত নির্ধারণের আধুনিক শাস্ত্র, যাকে বলে ‘জব্ত’। নবীজির যুগে আরবি হরফে নুকতা বা জের-জবর ছিল না, কারণ তৎকালীন আরবরা স্বাভাবিকভাবেই তা পড়তে পারতেন। পরে তাবেয়িদের যুগে অনারব মুসলিমদের কোরআন পাঠ সহজ করার জন্য নুকতা ও জের-জবর যুক্ত করা হয়।
যেহেতু জব্ত বা হরকতের পদ্ধতি সাহাবিদের যুগের পরে উদ্ভাবিত হয়েছে, তাই পাঠক স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে প্রাচীন আলেমগণ হরকত বসানোর ক্ষেত্রে কিছু ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছিলেন।
যেমন—মদিনা মুসহাফ ও দক্ষিণ এশীয় মুসহাফে ‘হামজাহ’ লেখার নিয়মে পার্থক্য দেখা যায়। মদিনা মুসহাফে উচ্চারিত হামজাহ বোঝাতে ‘আইন’ অক্ষরের ওপরের ছোট অংশ বসানো হয়। কিন্তু দক্ষিণ এশীয় অনুলিপিতে অনারব পাঠকদের সুবিধার জন্য সাধারণ আলিফের ওপর জবর, জের বা পেশ বসিয়ে সরাসরি উচ্চারণ নির্দেশ করা হয়। অনারব পাঠকেরা যাতে বিরতির পর নতুন শব্দ সহজে পড়তে পারেন, সে জন্যই এই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে।
ওয়াক্ফ ও পারার বিভাজন
কোরআন পাঠের সময় কোথায় থামতে হবে এবং কোথা থেকে পুনরায় শুরু করতে হবে, তা বোঝার জন্য বিরাম চিহ্ন বা ‘ওয়াক্ফ’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাহাবিদের যুগ থেকেই তেলাওয়াতের সময় সঠিক জায়গায় থামার নির্দেশমালা শেখানো হতো।
আমাদের অঞ্চলে ছাপা অনুলিপিতে প্রধানত ইমাম মুহাম্মদ ইবনে তাইফুর আস-সাজাওয়ান্দির (মৃ. ৫৬০ হি.) উদ্ভাবিত ওয়াক্ফ চিহ্ন (যেমন: ত, জ, স, জ়, ম, লা) ব্যবহার করা হয়। (ইবনে তাইফুর আস-সাজাওয়ান্দি, কিতাবুল ওয়াকফি ওয়াল ইবতিদা, ১/৪০, দারুস সালাম, কায়রো, ২০০৬)
সাজাওয়ান্দির চিহ্নগুলোর একটি বড় সুবিধা হলো, এতে সংক্ষিপ্ত বিরতির একাধিক সুযোগ থাকে, যা নতুন তিলাওয়াতকারী কিংবা অল্প শ্বাসে পড়া মানুষের জন্য বেশ সহায়ক।
অন্যদিকে মদিনা মুসহাফে মিসরের বাদশাহ ফুয়াদ কর্তৃক গঠিত ঐতিহ্যবাহী আলেম বোর্ডের নির্ধারিত ‘সলে’। (চালিয়ে যাওয়া উত্তম) কিংবা ‘কলে’ (থামা উত্তম) চিহ্ন ব্যবহার করা হয়।
এছাড়া পারার অভ্যন্তরীণ অংশ বিভাজনেও বৈচিত্র্য রয়েছে। মদিনা মুসহাফে প্রতিটি পারাকে আট ভাগে ভাগ করা হলেও দক্ষিণ এশীয় অনুলিপিতে চার ভাগে ভাগ করা হয়। পাশাপাশি আমাদের অঞ্চলের অনুলিপিতে প্রতি পৃষ্ঠায় ‘রুকু’ বা বিষয়ের সমাপ্তি নির্দেশক চিহ্ন থাকে, যা হিজরি চতুর্থ শতকের দিকে মধ্য এশিয়ার হানাফি আলেমগণ তারাবিহ নামাজে তেলাওয়াতের সুবিধার জন্য নির্ধারণ করেছিলেন। (ইবনে সোলাইমান আল-কাফিয়াজি, আত-তাইসির ফি কিরাআতির রাফ, পৃষ্ঠা ৮৯, দারুল বাশাইর, বৈরুত, ১৯৯৮)
একই বাণী, শুধু নান্দনিকতায় বৈচিত্র্য
মুদ্রিত অনুলিপির এসব বাহ্যিক ও কারিগরি পার্থক্য শুধু পাঠকদের তিলাওয়াত সহজ করার প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস মাত্র। লিপিশৈলী, নুকতা দেওয়া কিংবা থামার চিহ্নের পার্থক্যের মধ্যেও প্রতিটি অনুলিপিতে সংরক্ষিত কোরআনের মূল শব্দ, আয়াত ও খোদায়ি বাণী শতভাগ অভিন্ন ও অবিকৃত।
পৃথিবীর যে প্রান্তেরই অনুলিপি হোক না কেন, তা একই আসমানি গ্রন্থকে প্রতিনিধিত্ব করে। শত শত বছরের প্রখ্যাত গবেষক ও আলিমদের নিষ্ঠাপূর্ণ সাধনার মধ্য দিয়ে এই বিশ্বস্ত রূপগুলো আমাদের হাত পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে, যা বিশ্ব মুসলিমের নান্দনিক ঐতিহ্য ও ঐক্যের এক অনন্য নিদর্শন।