পাবনার সাঁথিয়া উপজেলায় মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচিত হওয়া গ্রাম পুলিশ সদস্য সাগর হোসেন অবশেষে তার মায়ের দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছেন। আদালতের কঠোর নির্দেশনা ও মধ্যস্থতার পর তিনি মায়ের ভরণপোষণসহ যাবতীয় দায়িত্ব গ্রহণের অঙ্গীকার করেন। একই সঙ্গে নিজের অনৈতিক আচরণের জন্য তিনি মা এবং দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।

রোববার (১১ অক্টোবর) পাবনা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সাঁথিয়া থানার আমলি আদালতে মা ও ছেলের পৃথক বক্তব্য শোনার পর তাদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধের সমাধান করা হয়। অভিযুক্ত সাগর হোসেন সাঁথিয়া উপজেলার নাগডেমরা ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং ওই ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশের সদস্য হিসেবে কর্মরত আছেন।

ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ৮ অক্টোবর, যখন সাগর ও তার মায়ের মধ্যকার ভরণপোষণ ও দায়িত্ব পালন সংক্রান্ত একটি পারিবারিক মামলার শুনানি সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। সেই শুনানিতে ইউএনও তাকে মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে বিস্তারিত বুঝিয়ে বলেন। তবে সাগর হোসেন আর্থিক সহায়তা দিতে রাজি হলেও মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান। এই ঘটনায় সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

সেই মুহূর্তের একটি ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং সাগরের আচরণের তীব্র সমালোচনা হয় নেটিজেনদের মাঝে। বিষয়টি আদালতের নজরে আসার পর আদালত স্বতপ্রণোদিত হয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। রোববার বিকেলে সাঁথিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিসুর রহমানকে নির্দেশ দেওয়া হয় যেন অভিযুক্ত ছেলে ও তার মাকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ওসি নিজের গাড়িতে করে তাদের দুজনকে আদালতে নিয়ে আসেন।

আদালতে শুনানির সময় মা ও ছেলের কথা শুনে সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেন বিচারক। এরপর সাগর হোসেন তার মায়ের ভরণপোষণের পূর্ণ দায়িত্ব নিতে সম্মত হন। নিজের ভুল বুঝতে পেরে মায়ের সঙ্গে এমন অমানবিক আচরণের জন্য তিনি গভীরভাবে অনুতপ্ত হন এবং ভবিষ্যতে আর কখনো এমন আচরণ করবেন না বলে আদালতকে কথা দেন। একই সাথে তিনি তার মা ও সাধারণ দেশবাসীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

ছেলের কাছে ফিরে আসার আনন্দে আপ্লুত বৃদ্ধা মুন্নি খাতুন বলেন, “আমার ছেলে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। আমি আমার ছেলেকে চেয়েছিলাম, অবশেষে তাকে ফিরে পেয়েছি। আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। ছেলের সব ভুল আমি মাফ করে দিয়েছি। এখন আমি ছেলের বাড়িতে ফিরে এসেছি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছেলের কাছেই থাকতে চাই। মা হিসেবে এটাই আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া।”

নিজের ভুল স্বীকার করে সাগর হোসেন বলেন, “ওসি স্যার আমাকে গাড়িতে করে আদালতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে আমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি। আগে আমি যা বলেছি, তা আবেগের বশে বলেছি, অনেক কথাই মিথ্যা ছিল। এখন বুঝতে পারছি, আমার ভুল হয়েছে। আমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি এবং অনুতপ্ত। এখন থেকে মাকে সঙ্গে নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে চাই। মাকে নিজের কাছে রেখে তার দেখাশোনা ও ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করতে চাই।”

পুরো বিষয়টি নিশ্চিত করে সাঁথিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিছুর রহমান জানান, বৃদ্ধা মা ও ছেলেকে একসঙ্গে তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।