২০১৩ সালে স্বামী সিরাজুল ইসলাম যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন ছেলে সাগর হোসেন এবং তার দুই বোন সপ্তম শ্রেণিতে পড়তেন। স্বামীর অকাল মৃত্যুর পর সন্তানদের আগলে রেখে তাদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য নিরলস চেষ্টা করেন মুন্নি খাতুন। এক সময় মা ও ছেলের সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর থাকলেও বর্তমানে সেই সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শেষ বয়সে অসুস্থ মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে একেবারেই রাজি নন ছেলে সাগর।

সম্প্রতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে আয়োজিত এক শুনানিতে মাকে সঙ্গে রাখার কথা বলা হলে সাগর হোসেন চরম প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, “মাকে আমার সঙ্গে দিলে আমি সুইসাইড করব। আমি মাকে সঙ্গে রাখতে পারব না। স্যার, আপনি বলে দেন, আমি মাকে মাসে কত টাকা দেব।”

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার সোনাতলা গ্রামের বৃদ্ধা মুন্নি খাতুনের ছেলের বিরুদ্ধে করা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মায়ের ভরণপোষণ ও দেখাশোনার বিষয়ে একটি স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা করা হলেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত সাগরকে বিষয়টি ভেবে দেখার জন্য আরও কয়েক দিনের সময় দেওয়া হয়।

মা ও ছেলের এই বিরোধের নেপথ্যে থাকা প্রকৃত কারণগুলো জানিয়েছেন মুন্নি খাতুনের বোনের স্বামী মাসুদ আলম এবং মেয়ে জামাই হাফিজুল ইসলাম। তাদের দাবি, দীর্ঘ দিন ধরেই এই সম্পর্কের মধ্যে টানাপড়েন চলছিল। বিশেষ করে সাগরের বিয়ের পর থেকেই মায়ের সঙ্গে তার দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে। পারিবারিক ও স্থানীয় পর্যায়ে একাধিকবার সমঝোতার চেষ্টা করা হলেও কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি।

মাসুদ আলম জানান, ২০১৩ সালে সিরাজুল ইসলাম মারা যাওয়ার সময় তার ছেলে-মেয়েরা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত। সন্তানদের বয়স খুব কম ছিল এবং তারা মায়ের কাছ থেকে দূরে চলে যাওয়ার ভয়ে কান্নাকাটি করত। সন্তানদের এই আবেগের কথা বিবেচনা করে মুন্নি খাতুন তখন পুনরায় বিয়ে করতে রাজি হননি।

তিনি আরও বলেন, “তখন আমি ঢাকায় চাকরি করতাম। বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে টাকা ধার করে তাদের দুজনের পড়াশোনার খরচ চালাতাম। তারা সোনাতলা হাইস্কুলে পড়াশোনা করেছে।” তিনি জানান, প্রায় আট বছর আগে মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয় এবং বর্তমানে মেয়ে ও জামাই চাকরির কারণে চট্টগ্রামে অবস্থান করছেন।

মাসুদ আলমের বর্ণনা অনুযায়ী, এক সময় মা ও ছেলে একসঙ্গেই থাকতেন। সাগরের সঙ্গে তার বোন ও ভাগনের সম্পর্কও বেশ ভালো ছিল। প্রায় তিন বছর আগে সাগর সাঁথিয়া পৌর এলাকায় আলাদা বাসা ভাড়া নেন। এরপরই তার বিয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

মাসুদ আলমের দাবি, সাগরের চাকরির ব্যবস্থা করতে বিয়ের আগেই ছয় থেকে সাত লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছিল। আত্মীয়স্বজনের মধ্যস্থতায় তার বিয়ে সম্পন্ন হয়। তবে বিয়ের পর থেকেই মায়ের সঙ্গে সাগরের দূরত্ব বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে এবং সাগর মাকে নিজের কাছে রাখতে অনীহা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, “আমরা অনেকবার বুঝিয়েছি। বর্তমান চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমানের সামনেও বসা হয়েছিল। কিন্তু সমাধান হয়নি। চেয়ারম্যান তার মায়ের জন্য বিধবা ভাতার কার্ডও করে দিয়েছিলেন।” এরপরও মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়া নিয়ে সমস্যা থেকেই যায়।

মাসুদ আলম আরও জানান, সাঁথিয়ার তৎকালীন ইউএনও রিজু তামান্নার সময়েও বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনা হয়েছিল। তখন মায়ের ভরণপোষণ না দেওয়ার অভিযোগে সাগরের বেতন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

তিনি আরও দাবি করেন, মা-ছেলের এই বিরোধ নিয়ে এক পর্যায়ে সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গেও আলোচনা করা হয়েছিল। সেনাবাহিনীও ব্যবস্থা নিতে চেয়েছিল, তবে ছেলের চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কায় মুন্নি খাতুন ছেলের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে রাজি হননি।

সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের কথা উল্লেখ করে মাসুদ আলম জানান, জাল দলিলের মাধ্যমে বোনের সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি জমি লিজ দিয়ে সেই টাকাও সে আত্মসাৎ করে। এছাড়া মাকে দোষী প্রমাণ করতে বিভিন্ন জায়গায় এবং ফেসবুক কমেন্টসে অভিযুক্ত ছেলে বিরূপ মন্তব্য করে যাচ্ছে। পূর্বে তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

আক্ষেপ করে মাসুদ আলম বলেন, “একজন মা সারাজীবন সন্তানদের জন্য কষ্ট করেছেন। অথচ শেষ বয়সে এসে সেই মাকেই সন্তানের কাছে আশ্রয়ের জন্য অন্যের দ্বারে যেতে হচ্ছে। আত্মীয় হিসেবে আমরা অনেক চেষ্টা করেছি যেন সমাধান হয়। কিন্তু কোনোভাবেই সমাধান করতে পারিনি।”

সাগরের শ্বশুরবাড়ি এবং স্ত্রীর প্রশ্রয়ে মায়ের সঙ্গে এমন দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এক বাবার এক ছেলে হওয়ায় মেয়ের জেদেও সম্পর্কের এই অবনতি ঘটেছে বলে তার দাবি।

মুন্নি খাতুনের মেয়ে জামাই হাফিজুল ইসলাম জানান, শাশুড়ি ও সাগরের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে তিনি একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েছেন। গত বছরের নভেম্বরেও সমঝোতার জন্য গিয়েছিলেন, কিন্তু সাগর সেখানে উপস্থিত হননি।

হাফিজুল ইসলাম বলেন, “আমি সাগর ও তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমার কথাও তারা রাখেনি। শাশুড়ির ভরণপোষণ করা হয় না। তার হার্টের সমস্যা হলে আমি তাকে পাবনা হাসপাতালে নিয়ে গেছি। এখন সাগরের সঙ্গে তার বোনেরও যোগাযোগ নেই। আমাদের সঙ্গেও সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।”

তিনি আরও বলেন, শাশুড়ির জন্য তারা সবসময় চেষ্টা করছেন এবং মিল করানোর অনেক উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু সমস্যা এখন অনেক দূর গড়িয়েছে। একজন অসুস্থ বৃদ্ধা মায়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা বর্তমানে অত্যন্ত চিন্তিত।

মেয়ে আসিফা খাতুন বলেন, “আমি এ ঘটনায় অনেক বিব্রত হয়েছি। মাকে সে ভরণপোষণ দেবে না এটা দুঃখজনক। বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। আমরা সাধ্য অনুযায়ী মাকে দেখাশোানা করে যাচ্ছি। আমার ভাই আমাদের থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছে। সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। আমার ভাই নিজেকে শুধরিয়ে মাকে তার কাছে রেখে ভরণপোষণ দেবে বলে আশা পোষণ করি।” পাশাপাশি তিনি ভাইয়ের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

অভিযুক্ত ছেলে সাগর হোসেনকে তার মোবাইলে কল করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়েই কলটি কেটে দেন এবং এরপর আর ফোন রিসিভ করেননি।

এই বিষয়ে সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, অভিযোগের শুনানি হয়েছে এবং বিষয়টি মানবিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। সাগরকে কয়েক দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। আগামী দুই দিনের মধ্যে সমাধান করতে আবারো ছেলে ও মাকে ডাকা হবে।