সরকারি বিধি অনুযায়ী বাসে বা ট্রেনে যাতায়াতের কথা থাকলেও নিয়ম বহির্ভূতভাবে শতাধিকবার বিমানে ভ্রমণ এবং আদালতের ভুয়া সনদ ব্যবহার করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক দুলাল কৃষ্ণ সাহাকে। বিভাগীয় তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে এসব গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

আজ রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তাঁকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দুলাল কৃষ্ণ সাহা ২০০০ সালের ২৮ জুন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের রাসায়নিক পরীক্ষক (ষষ্ঠ গ্রেড) পদে যোগদান করেন এবং ২০২৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি এই পদে কর্মরত ছিলেন।

তদন্তে দেখা গেছে, গত ২৩ বছরে দেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণের ক্ষেত্রে উড়োজাহাজে যাতায়াতের কোনো প্রাধিকার বা অনুমোদন তাঁর ছিল না। তা সত্ত্বেও তিনি শতাধিকবার দেশের বিভিন্ন স্থানে বিমানে ভ্রমণ করেন এবং সেই ভ্রমণের বিল দাখিল করে সরকারি অর্থ উত্তোলন করেন। নিয়ম অনুযায়ী, তাঁর এই ভ্রমণ বিবরণী ও বিলে অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল। তবে তিনি ভ্রমণকারী কর্মকর্তা, নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা এবং প্রত্যয়নপত্রের স্থানে ভিন্ন ভিন্ন তিনটি স্বাক্ষর ব্যবহার করেছেন। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই তিন ক্ষেত্রেই প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক হিসেবে তিনি তাঁর নিজস্ব সিল ব্যবহার করেছিলেন।

উল্লেখ্য, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভ্রমণবিষয়ক নির্দেশিকা অনুযায়ী, ষষ্ঠ গ্রেডের একজন কর্মকর্তা সরকারি কাজে যাতায়াতের জন্য বাস বা ট্রেন ব্যবহার করতে পারেন এবং সরকার সেই খরচ বহন করে। এই গ্রেডের কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগত খরচে বিমানে ভ্রমণ করতে পারলেও সরকারের কাছ থেকে বিমানের ভাড়া দাবি করতে পারেন না; সেক্ষেত্রে তিনি কেবল বাস বা ট্রেনের ভাড়া পাবেন।

প্রজ্ঞাপনে আরও জানানো হয়েছে, ঢাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন দুলাল কৃষ্ণ সাহা দীর্ঘ সময় ধরে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা আদালতে সমন ও সাক্ষ্য দেওয়ার ভুয়া সনদ তৈরি করেন। এরপর ওই ভুয়া সনদগুলোর বিপরীতে বিল জমা দিয়ে বিধিবহির্ভূতভাবে সরকারি অর্থ উত্তোলন করেন তিনি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি সরকারি কোষাগার থেকে মোট ৩ লাখ ১৫ হাজার ৭৫৭ টাকা অবৈধভাবে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন, যার ফলে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত বছর ১১ অক্টোবর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) ও ৩(ঘ) বিধি অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতিপরায়ণতার’ দায়ে অভিযুক্ত করে একই বছরের ১৯ নভেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয় এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়।

দুলাল কৃষ্ণ সাহা ১৫ ডিসেম্বর অভিযোগের জবাব প্রদান করেন এবং ব্যক্তিগত শুনানির আবেদন জানান। চলতি বছরের ১১ মার্চ তাঁর ব্যক্তিগত শুনানি অনুষ্ঠিত হয় এবং পরদিন ১২ মার্চ তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা তাঁর প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে, অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এর ফলে বিধিমালা অনুযায়ী তাঁকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই বিষয়ে চলতি বছরের ২০ জুন তাঁকে দ্বিতীয়বার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়, যার জবাব তিনি ২ জুলাই প্রদান করেন। তবে জবাব পর্যালোচনার পর গুরুদণ্ডের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়। পরবর্তীতে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) পরামর্শ চাওয়া হলে কমিশন গত ২৭ সেপ্টেম্বর তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর পক্ষে মত দেয়।

সার্বিক তদন্ত ও পর্যালোচনার পর সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী অসদাচরণের দায়ে দুলাল কৃষ্ণ সাহাকে একই বিধিমালার ৪(৩)(খ) বিধি অনুযায়ী চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।