মাত্র ৮ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষ শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়া এবং ম্যাচটি তাদের নিজেদের মাটিতেই। এমন কঠিন পরিস্থিতি থেকে দুর্দান্ত এক ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প লিখলেন সোবহানা মোস্তারি। ক্যারিয়ারের প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরির মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ডটি নিজের করে নিয়েছেন। অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতির সঙ্গে গড়ে তুললেন রেকর্ড জুটিও। এই দুই ব্যাটারের অসাধারণ ব্যাটিংয়ের ওপর ভর করে অস্ট্রেলিয়াকে ২২১ রানের লক্ষ্য দিয়েছে বাংলাদেশ।

রোববার (১১ অক্টোবর) ব্রিসবেনের অ্যালান বোর্ডার ফিল্ডে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ১৩৪ বলে ১৮টি চার মেরে ১১৮ রান করেন মোস্তারি। অন্যদিকে ১১৪ বলে ৭টি চারে ৭৪ রানে অপরাজিত থাকেন অধিনায়ক জ্যোতি। এই দুজনের ১৯৫ রানের বিশাল জুটিতে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৬ উইকেটে ২২০ রান তোলে বাংলাদেশ।

টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই বিপর্যয়ে পড়ে সফরকারী দল। চতুর্থ ওভারে মেগান শাটের বলে উইকেটরক্ষক বেথ মুনির হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন ফারজানা হক। ১৩ বল খেলেও রানের খাতা খুলতে পারেননি তিনি। এরপর ষষ্ঠ ওভারের শেষ বলে শারমিন সুলতানাকে এলবিডব্লিউ করেন কিম গার্থ। পরের ওভারের দ্বিতীয় বলে শারমিন আক্তারকে বোল্ড করেন শাট। মাত্র ৭ দশমিক ২ ওভারে বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়ায় ৩ উইকেটে ৮ রান।

ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় মোস্তারি ও জ্যোতির প্রতিরোধ। অস্ট্রেলিয়ার পেসারদের শুরুর দিকের সুইং সামলে ধীরে ধীরে ইনিংস গড়ে তোলেন তারা। এক প্রান্তে অধিনায়ক উইকেট আগলে রেখে ধৈর্য ধরেন, আর অন্য প্রান্তে সুযোগ বুঝে বাউন্ডারি আদায় করতে থাকেন মোস্তারি।

৬৬ বলে ক্যারিয়ারের চতুর্থ ওয়ানডে ফিফটি পূর্ণ করেন মোস্তারি। লেগ স্পিনার অ্যালানা কিংয়ের এক ওভারে দুটি চার মেরে অর্ধশতকের মাইলফলকে পৌঁছান তিনি। এরপর আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন এই ব্যাটার। অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে নিয়মিত বাউন্ডারি তুলে রানের গতি বাড়াতে থাকেন তিনি।

অন্যদিকে ৯৭ বলে ফিফটি করেন জ্যোতি। তার ধৈর্যশীল ব্যাটিংয়ের কারণেই শুরুর বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। তবে রান সংগ্রহের মূল দায়িত্বটি পালন করেন মোস্তারিই।

১২৩ বলে ক্যারিয়ারের প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন মোস্তারি। অ্যানাবেল সাদারল্যান্ডের বলে দ্রুত এক রান নিয়ে তিন অঙ্কে পৌঁছেই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন ২৪ বছর বয়সী এই ব্যাটার। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের নারী ওয়ানডে ইতিহাসে শতক করা তৃতীয় ক্রিকেটার হয়ে যান তিনি।

সেঞ্চুরির পরও থামেননি মোস্তারি। আরও আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে নিজের ইনিংস এগিয়ে নিতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত ৪৮তম ওভারের পঞ্চম বলে শাটের নিচু ফুলটসে বড় শট খেলতে গিয়ে বোল্ড হন তিনি। ১৩৪ বলে ১৮টি চারে ১১৮ রান করে মাঠ ছাড়ার সময় অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের কাছ থেকেও অভিনন্দন পান মোস্তারি। করতালিতে তাঁকে অভিবাদন জানান দর্শকেরা।

ততক্ষণে বাংলাদেশের নারী ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন তিনি। এর আগে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর ছিল ফারজানা হকের ১০৭ রান, যা ২০২৩ সালে ভারতের বিপক্ষে মিরপুরে করা হয়েছিল।

শুধু ওয়ানডে নয়, আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি মিলিয়েও বাংলাদেশের কোনো নারী ক্রিকেটারের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস এখন মোস্তারির ১১৮ রান। এর আগে ২০১৯ সালে নেপালের পোখারায় মালদ্বীপের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে অপরাজিত ১১৩ রান করেছিলেন জ্যোতি।

মোস্তারি ও জ্যোতির ১৯৫ রানের জুটিতে ভেঙেছে বাংলাদেশের নারী ওয়ানডের আগের সর্বোচ্চ জুটির রেকর্ড। ২০২৫ সালের এপ্রিলে থাইল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় উইকেটে ১৫২ রান যোগ করেছিলেন জ্যোতি ও শারমিন আক্তার। এবার সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে চতুর্থ উইকেটে নতুন ইতিহাস গড়েছেন মোস্তারি ও জ্যোতি।

শুধু বাংলাদেশের রেকর্ডই নয়, ব্রিসবেনের অ্যালান বোর্ডার ফিল্ডে নারী ওয়ানডের সর্বোচ্চ জুটির কীর্তিও এখন তাদের। এর আগে ২০১৯ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার অ্যালিসা হিলি ও র‍্যাচেল হেইন্সের ১৫৯ রানের জুটি ছিল এই মাঠের সর্বোচ্চ।

বাংলাদেশের নারী ওয়ানডেতে এর আগে শতক করেছিলেন কেবল ফারজানা হক ও জ্যোতি। ২০২৩ সালে ভারতের বিপক্ষে ১০৭ রান করে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে এই সংস্করণে সেঞ্চুরি করেন ফারজানা। একই বছরের ডিসেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে করেন ১০২ রান। এরপর ২০২৫ সালে থাইল্যান্ডের বিপক্ষে ৮০ বলে ১০১ রান করেন জ্যোতি। মোস্তারির ব্যাট থেকে এল বাংলাদেশের নারী ওয়ানডে ইতিহাসের চতুর্থ ব্যক্তিগত শতক।

এবারের সেঞ্চুরির বিশেষত্ব আরও একটি জায়গায়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে এটিই প্রথম ওয়ানডে শতক। এর আগে গত বছরের বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৬৬ রানে অপরাজিত ছিলেন মোস্তারি। এবার নিজের সেই ইনিংসকেও অনেক দূরে ছাড়িয়ে গেলেন তিনি।

বাংলাদেশের নারী দলের জন্য এবারের অস্ট্রেলিয়া সফর এমনিতেই ঐতিহাসিক। ২০২০ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে দেশটিতে গেলেও এবারই প্রথম সেখানে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলছে তারা। সেই সফরের দ্বিতীয় ওয়ানডেতেই সেঞ্চুরি করলেন মোস্তারি।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে এমন কীর্তির নজির অবশ্য অন্য দেশের ক্রিকেটারদেরও আছে। ২০১৯ সালে শ্রীলঙ্কার চামারি আতাপাত্তু এই অ্যালান বোর্ডার ফিল্ডেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১০৩ রান করেছিলেন। এবার একই মাঠে শতক পেলেন বাংলাদেশের মোস্তারি।

বাংলাদেশের ইনিংসের ৪৮তম ওভারে মোস্তারি-জ্যোতির ১৯৫ রানের জুটি ভাঙেন শাট। ২০৩ রানে চতুর্থ উইকেট হারানোর পর শেষদিকে আরও দুটি উইকেট পড়ে বাংলাদেশের। স্বর্ণা আক্তার ৮ রান করেন, রিতু মনি ফেরেন রানআউট হয়ে। তবে এক প্রান্ত আগলে রেখে অপরাজিত থাকেন জ্যোতি।

অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ১০ ওভারে ৩৬ রান দিয়ে ৪ উইকেট নেন শাট। কিম গার্থ ১০ ওভারে ৩৫ রানে নেন একটি উইকেট।

প্রথম ওয়ানডেতে ১৬৬ রানে অলআউট হয়ে ৭ উইকেটে হেরেছিল বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে মাত্র ২ রান করেছিলেন মোস্তারি। দুই দিনের ব্যবধানে একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এবার খেললেন বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস।