সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষার মান যে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা প্রায়ই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসে। তবে সিলেটের জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় যে, অন্য কোনো বিদ্যালয়ের সঙ্গে এর তুলনা করা সম্ভব নয়। মুক্তকণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা গেছে, নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে দীর্ঘ ৫৭ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৮৬ জন। অথচ এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে পাঠদানের জন্য শিক্ষক রয়েছেন মাত্র দুজন। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মোট পাঁচটি শ্রেণিতে অসংখ্য বিষয় রয়েছে; এই পরিস্থিতিতে মাত্র দুজন শিক্ষক কীভাবে সব বিষয় পড়ান, তা সত্যিই এক বিস্ময়কর প্রশ্ন।

শিক্ষাবর্ষের দীর্ঘ ৯ মাস অতিবাহিত হওয়ার পর গত ২৬ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো ইসলাম শিক্ষা বিষয়ে ক্লাস করার সুযোগ পেয়েছে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। উল্লেখ্য, বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে কর্মরত দুজন শিক্ষকের মধ্যে একজন ইসলাম শিক্ষার শিক্ষক। কিন্তু চরম শিক্ষক সংকটের কারণে তাঁকে বাধ্য হয়ে অন্যান্য বিষয়ের ক্লাস নিতে হচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, সকাল নয়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত ওই দুজন শিক্ষককে বিরতিহীনভাবে পিরিয়ড নিতে হচ্ছে। এমনকি টিফিনের বিরতিতেও তাঁরা ক্লাস নিচ্ছেন। দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে একটানা কাজ করে কারও পক্ষে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকা সম্ভব নয়।

মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা সম্পূর্ণ বিষয়ভিত্তিক। তাই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষ শিক্ষক থাকা অপরিহার্য। জাতীয় শিক্ষানীতির নির্দেশনা অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরে গড়ে প্রতি ৩০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক থাকা প্রয়োজন। কিন্তু জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত; এখানে একজন শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৪৩ জন।

এই চরম বাস্তবতার মুখে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকেরা নিজেদের উদ্যোগে কয়েকজন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। সংকট নিরসনে বাধ্য হয়ে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, নিয়োগপ্রাপ্ত খণ্ডকালীন শিক্ষকদের যোগ্যতা ও মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক। এছাড়া এই প্রক্রিয়ায় অভিভাবকদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপের বোঝা চেপেছে। সরকারি বিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ কোনো স্থায়ী বা টেকসই সমাধান হতে পারে না। সব মিলিয়ে শিক্ষক সংকটের কারণে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

অভিভাবকদের মতে, সিলেট শহর থেকে বিদ্যালয়টি অনেক দূরে অবস্থিত হওয়ায় এখানে শিক্ষক হিসেবে যোগদানে অনেকের অনীহা কাজ করে। এমনকি চাকরিজীবনের প্রথম পদায়ন হিসেবে এই বিদ্যালয়ে পাঠানো হলেও শিক্ষকেরা তদবিরের মাধ্যমে দ্রুত সেখান থেকে চলে যান। চলতি বছরেই তিনজন শিক্ষক এই বিদ্যালয় ছেড়ে অন্যত্র বদলি হয়ে গেছেন। উপজেলা পর্যায়ের একটি বিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকেরা যখন তদবির করে অন্য জায়গায় বদলি হওয়ার সুযোগ পান, তখন স্পষ্ট হয় যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ভেতরেই মূল সমস্যাটি বিদ্যমান। শিক্ষক বদলির প্রক্রিয়াটি অন্যায্য এবং দুর্নীতিগ্রস্ত বলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ ও বদলির এই অন্যায্য ব্যবস্থা থেকে মাউশিকে বেরিয়ে আসতে হবে। জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দিন।