দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় রাঙামাটির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। জেলার অনেক বিদ্যালয়ে মাত্র দু-তিনজন শিক্ষক দিয়েই কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যার ফলে সামগ্রিক প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
জেলা শিক্ষা অফিসের দেওয়া তথ্যানুসারে, রাঙামাটি জেলার মোট ৭০৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৩৮টিতেই কোনো প্রধান শিক্ষক নেই। এছাড়া সহকারী শিক্ষকের ৭৫৯টি পদ শূন্য থাকায় মোট ১ হাজার ১৯৭টি পদের শূন্যতা নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে পাঠদান কার্যক্রম।
শূন্যপদ পূরণের লক্ষ্যে ২০২২ সালের মে মাসে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছিল এবং ওই বছরের ২৩ অক্টোবর পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয়। তবে আবেদনের বয়সসীমা ৪০ বছর নির্ধারণের বিষয়ে স্থগিতাদেশ আসায় পরীক্ষাটি স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৪ মে পুনরায় পরীক্ষার তারিখ দেওয়া হলেও পরীক্ষার্থীদের বয়স নির্ধারণের জটিলতা সমাধান না হওয়ায় বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
পার্বত্য চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, তিন পার্বত্য জেলার মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ স্থানীয় জেলা পরিষদের অধীনে ন্যস্ত। সেই প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বয়সসীমা ৪০ থেকে কমিয়ে ৩২ বছর নির্ধারণ করে ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই জেলা পরিষদ পুনরায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। পরীক্ষার তারিখ নির্ধারিত হয় ১৪ অক্টোবর। তবে কোটাব্যবস্থা নিয়ে জেলা পরিষদের সঙ্গে স্থানীয় দুটি পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হলে আন্দোলন শুরু হয় এবং সেই পরীক্ষাও স্থগিত হয়ে যায়। এরপর একই বছরের ২১ নভেম্বর পুনরায় পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হলেও কোটাব্যবস্থা সমাধানের দাবিতে শহরে হরতাল পালনের কারণে জেলা পরিষদ পুনরায় পরীক্ষা স্থগিত করে।
আন্দোলনকারী একটি পক্ষের দাবি, সারা দেশের মতো ৯৩ শতাংশ মেধা এবং ৭ শতাংশ কোটার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হোক। অন্যদিকে অপর পক্ষের দাবি, জেলা পরিষদের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হোক। বর্তমানে কোটাব্যবস্থা সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট ফাইল আইন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, এখন পর্যন্ত এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মোট ৭০৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ ৭০৭টি থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২৬৯ জন।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১০টি উপজেলার মধ্যে রাঙামাটি সদর উপজেলায় ৪৬টি, কাউখালী উপজেলায় ৩৭টি, নানিয়ারচর উপজেলায় ৩৫টি, বরকল উপজেলায় ৩৫টি, জুরাছড়ি উপজেলায় ১৯টি, লংগদু উপজেলায় ৬০টি, বাঘাইছড়ি উপজেলায় ৮৩টি, কাপ্তাই উপজেলায় ২৬টি, রাজস্থলী উপজেলায় ৩৯টি এবং বিলাইছড়ি উপজেলায় ৯টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।
প্রধান শিক্ষকের পাশাপাশি জেলায় সহকারী শিক্ষকের মোট পদ ৩ হাজার ৩৩২টি, যার মধ্যে কর্মরত আছেন ২ হাজার ৫৭৩ জন। ফলে সহকারী শিক্ষকের ৭৫৯টি পদ শূন্য। এর মধ্যে রাঙামাটি সদর উপজেলায় ৪৯টি, কাউখালী উপজেলায় ৫১টি, নানিয়ারচর উপজেলায় ৬৩টি, বরকল উপজেলায় ৭৫টি, জুরাছড়ি উপজেলায় ৭৩টি, লংগদু উপজেলায় ১১২টি, বাঘাইছড়ি উপজেলায় ১৬৩টি, কাপ্তাই উপজেলায় ৩৪টি, রাজস্থলী উপজেলায় ৭৪টি এবং বিলাইছড়ি উপজেলায় ৬৫টি পদ শূন্য রয়েছে।
তবে পরিসংখ্যানগত তথ্যের চেয়ে বাস্তব চিত্র আরও করুণ বলে জানা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে পদ পূরণ দেখানো হলেও ওই শিক্ষকরা বাস্তবে বিদ্যালয়ে কর্মরত নেই। কর্মরত শিক্ষকদের একটি অংশ রাঙামাটি জেলা সদরের পিটিআইয়ে দেড় বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণে নিয়োজিত আছেন, যাদের কাগজে-কলমে কর্মরত দেখানো হচ্ছে।
পাশাপাশি পিডিপি-৩ এবং স্লিসহ প্রাথমিক শিক্ষার বিভিন্ন বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণে প্রধান শিক্ষকদের অংশগ্রহণ করতে হয়, ফলে বছরের একটি বড় সময় তারা বিদ্যালয়ের বাইরে থাকেন। এছাড়া মেডিকেল ছুটি ও সিএল ছুটির কারণেও অনেক শিক্ষক অনুপস্থিত থাকেন, যদিও তারা কর্মরত হিসেবেই গণ্য হন।
বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, জেলা বা উপজেলা সদর এবং যোগাযোগ সুবিধাসম্পন্ন বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট তুলনামূলক কম। তবে দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে এই সংকট অত্যন্ত প্রকট। এমন অনেক বিদ্যালয় রয়েছে যেখানে মাত্র একজন বা দুজন শিক্ষক কর্মরত। আবার কিছু বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ১৫ থেকে ২০ জনের মতো।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য থাকার বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কফিল উদ্দিন বলেন, “জনবল কম থাকায় শিক্ষকদের বেশি পরিশ্রম করতে হচ্ছে। তারা তাদের সবটুকু দিয়ে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। শিক্ষক নিয়োগের জন্য অনেকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সমস্যার সমাধান হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “বিষয়টি সমাধানে আইন মন্ত্রণালয়ে আছে শুনেছি। আবার শুনেছি, আইন মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত দিয়ে দিয়েছে—মেধায় ৯৩ ভাগ ও কোটায় ৭ ভাগের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া করার জন্য। তবে এখনো এমন কোনো পত্র পাইনি।”
রাঙামাটি জজ কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট প্রতীম রায় পাম্পু বলেন, “যে মতামত এসেছে, এটিই সঠিক। আইনের মাধ্যমেই চুক্তি হয়েছে। পূর্বে নিয়োগে ‘অগ্রাধিকার’ শব্দটি ব্যবহার করত জেলা পরিষদ, তাতে অব্যবহার করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে আর কোনো জটিলতা সৃষ্টি হবে না।”
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, “এখন অগ্রাধিকার বলতে বোঝানো হয়েছে, পরীক্ষায় একটি পদের জন্য একজন বাঙালি ও একজন উপজাতি পরীক্ষার্থী অংশ নিলেন। সেখানে উভয়ে সমান নম্বর পেলে তখন উপজাতি পরীক্ষার্থী অগ্রাধিকার পেতে পারেন।”
রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দীপন তালুকদার বলেন, “চাকরিতে সারা দেশের ন্যায় ৯৩ শতাংশ মেধা ও ৭ শতাংশ কোটার ভিত্তিতে নিয়োগের বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা পেয়েছি। সরকার যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছে, সেভাবেই নিয়োগ প্রক্রিয়ার কাজ চলমান রয়েছে। দ্রুত নিয়োগ শেষ করে বিদ্যালয়গুলোতে যে শিক্ষক সংকট রয়েছে, তা দূর করতে সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। নিয়োগ শেষ হলেই এই সংকট দূর হবে।”