দুপুরের বিরতির সময় ক্যানটিনে শিক্ষার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। কেউ তৃপ্তির সাথে খিচুড়ি খাচ্ছে, আবার কেউ পরোটা বা রুটি নিয়ে ব্যস্ত। তবে সবচেয়ে বেশি আনন্দের বিষয় হলো বিল দেওয়ার সময়। কারণ, পেটভরা খাবারের দাম মাত্র ২০ টাকা। বর্তমান বাজারে যে মানের খাবার কিনতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা খরচ করতে হয়, এখানে তা পাওয়া যাচ্ছে প্রায় অর্ধেক দামে। এমনকি সপ্তাহের নির্দিষ্ট কিছু দিনে একই মূল্যে মাংস-খিচুড়িও পরিবেশন করা হয় এখানে।

কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় এক বছর ধরে এই স্বল্পমূল্যের খাবারের ব্যবস্থা করে আসছেন ৫৫ বছর বয়সী মো. ছবেদ আলী। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অবস্থিত ‘খাদ্য ছায়া স্কুল ক্যানটিন’ পরিচালনা করছেন তিনি। প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১২০ জন শিক্ষার্থী এখান থেকে খাবার গ্রহণ করে থাকে।

টিফিনের সংক্ষিপ্ত সময়ে শিক্ষার্থীদের জন্য বাসায় হেঁটে গিয়ে খেয়ে পুনরায় স্কুলে ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব। এছাড়া ভ্যানে যাতায়াত করতে গেলে আসা-যাওয়ায় ২০ টাকা ভাড়া খরচ হয়ে যায়, যা সব সময় সহজলভ্যও নয়। শিক্ষার্থীদের মতে, ভ্যানে যাতায়াতের ওই ২০ টাকা খরচ করে ছবেদ আলী কাকার ক্যানটিনে তারা দুপুরে পেটভরা খাবার খেতে পারছে।

তবে ছবেদ আলীর নিজের জীবনটা ছিল চরম সংগ্রামের। ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের ফলে তিনি তাঁর বসতভিটা হারিয়েছেন এবং বর্তমানে শৌলমারী বাজারের পাশে অন্যের জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। আগে তাঁর আয়ের কোনো নির্দিষ্ট উৎস ছিল না। বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের ভেতরে ক্যানটিন চালানোর সুযোগ পাওয়ার পর সেটিই তাঁর জীবনধারণের প্রধান অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েক বছর আগে এক দুর্ঘটনায় মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত পান ছবেদ আলী, যার ফলে তিনি এখনো ভারী কোনো কাজ করতে সক্ষম নন। নিজের আর্থিক সংকট এবং শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করে তিনি খাবারের দাম অত্যন্ত কম রেখেছেন।

ক্যানটিনে খিচুড়ি, পরোটা, ডাল ও রুটিসহ অধিকাংশ খাবারের দাম শিক্ষার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে মাত্র ২০ টাকা। ছয়জন কর্মচারীর বেতন, রান্নার উপকরণ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মেটানোর পর এই দামে খাবার বিক্রি করে খুব একটা লাভ হয় না। তা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের কথা ভেবেই এই উদ্যোগ ধরে রেখেছেন ছবেদ। তিনি বলেন, ‘আগে বিভিন্ন বাড়ির অনুষ্ঠানে রান্না করতাম। পরে স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাকে এখানে ক্যানটিন করার সুযোগ দিয়েছে। পরিবারে আমি আর স্ত্রী, দুইটা মানুষ। তাই ছাত্র-ছাত্রীদের কম টাকায় খাওয়াতে পারি। অভাবী এলাকা, সবাই গরিব পরিবার থেকে আসে। কেউ টাকা নাই কইলে আর জোর করি না।’

২০২৫ সালে স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের সাথে আলোচনার পর ক্যানটিনটি চালু করা হয়। যদিও ক্যানটিনের স্বত্বাধিকারী বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, তবে এর সম্পূর্ণ পরিচালনা করছেন ছবেদ আলী।

২০ টাকায় খাবার বিক্রি করে সীমিত লাভ হলেও সংসার চালানোর উপায় খুঁজে নিয়েছেন তিনি। ছবেদ আলী জানান, স্কুলের সময় শেষ হলে অন্য ক্রেতারা ক্যানটিনে আসেন এবং তখন যে লাভ হয়, তা দিয়েই তাঁর সংসার চলে। বিদ্যালয় চলাকালীন ক্যানটিনের প্রধান ক্রেতা হিসেবে থাকে শিক্ষার্থীরা এবং এই সময়ে বাইরের ক্রেতাদের কাছে খাবার বিক্রি করা হয় না। ক্লাস শেষ হওয়ার পর বাইরের ক্রেতাদের জন্য ক্যানটিনটি খুলে দেওয়া হয়।

ক্যানটিনের খাবারের মান সম্পর্কে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফরহাদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘বাজারের খাবারের দামের অর্ধেকে এখানে খাওয়া যায়। এটা আমাদের জন্য খুবই উপকারী।’

নবম শ্রেণির ছাত্রী রেশমা আক্তারের বাসা স্কুল থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে। তাঁর ভাষ্য, ‘টিফিনের সময় বাসায় হেঁটে গিয়ে খেয়ে আবার স্কুলে ফিরে আসা সম্ভব নয়। ভ্যানে যেতে-আসতে ২০ টাকা ভাড়া লাগে। সব সময় ভ্যান পাওয়াও যায় না। ছবেদ আলী কাকার ক্যানটিনে ওই টাকায় দুপুরে পেট ভরে খাওয়া যায়।’

ক্যানটিনটি চালু হওয়ার ফলে শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে মানসম্মত খাবার পাচ্ছে। আশপাশের অন্যান্য হোটেলের তুলনায় এখানকার খাবারের মান অনেক উন্নত বলে মনে করা হয়।

২০২৫ সালে স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে ক্যানটিনটি চালু করা হয়। ক্যানটিনের স্বত্বাধিকারী বিদ্যালয় হলেও এর পরিচালনা করছেন ছবেদ আলী।

চর শৌলমারী বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. খলিলুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ক্যানটিনটি চালু হওয়ায় শিক্ষার্থীরা অল্প দামে খাবার খেতে পারছেন। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিয়মিত ক্যানটিন তদারক করে। আশপাশের অন্য হোটেলের তুলনায় এখানকার খাবারের মানও ভালো।”