চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে চন্দনা রানী শীল হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত এবং নিহতের স্বামী শিমুল শীল গতকাল শনিবার আদালতের সামনে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তিনি জানান, আরও দুই তরুণের সহায়তায় তিনি তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করেছেন।

চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শাখাওয়াত হোসেনের আদালতে এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন শিমুল শীল। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্য দুই তরুণের নাম প্রকাশ করেন, যারা হলেন নজরুল ইসলাম ও ইলিয়াস হোসেন। সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম জানান, শিমুলের স্বীকারোক্তির পরপরই পুলিশ ওই দুই অভিযুক্তকেও গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। পুলিশি তদন্তে জানা গেছে, ভালোবেসে বিয়ের মাত্র এক বছরের মাথায় সন্দেহের বশবর্তী হয়েই শিমুল তাঁর স্ত্রীকে খুন করেন।

ঘটনার পর গত শুক্রবার বিকেলে সীতাকুণ্ডের টেরিয়াইল এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে শিমুল শীলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরবর্তীতে একই এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে তাঁর ভাই পীযূষ শীলকেও গ্রেপ্তার করা হয়।

ওসি মহিনুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ঘটনার পর দায়ের করা হত্যা মামলার শিমুল ও পীযূষকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে জিজ্ঞাসাবাদের পর শিমুল হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেন এবং নজরুল ও ইলিয়াসের জড়িত থাকার তথ্য দেন। এরপর রাতেই নজরুল ও ইলিয়াসকে ভাটিয়ারী ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল গ্রেপ্তার চারজনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।”

গত শুক্রবার সকালে সীতাকুণ্ড উপজেলার বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের টেরিয়াইল উচ্চবিদ্যালয়ের পেছন থেকে হাত বাঁধা অবস্থায় চন্দনা রানী শীলের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত চন্দনা উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ পশ্চিম সৈয়দপুর এলাকার তেজেন্দ্র দাশের কন্যা।

পুলিশ ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক বছর আগে শিমুল ও চন্দনার মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তবে বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে চন্দনাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ করেন তাঁর পরিবার। ঘটনার আগের দিনও নির্যাতনের শিকার হয়ে চন্দনা তাঁর বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু পরে স্বামী শিমুল তাঁকে পুনরায় ডেকে নিয়ে যান এবং তার একদিন পরেই পরিবারের সদস্যরা তাঁর মৃত্যুর খবর পান।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে গ্রেপ্তার শিমুল জানান, তাঁর স্ত্রী চন্দনা রানীর সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক ছিল বলে তিনি সন্দেহ করতেন। এই বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে তীব্র ঝগড়া হয়। ঘটনার রাতে তিনি চন্দনাকে এই বিষয়ে জেরা করেন এবং সেই সময় সেখানে নজরুল উপস্থিত ছিলেন। একপর্যায়ে চন্দনা আইনি ব্যবস্থা বা মামলার হুমকি দিলে তাঁরা তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন। এই হত্যাকাণ্ডে নজরুলের বন্ধু ইলিয়াসও অংশ নেয়। এভাবে তিনজনে মিলে চন্দনাকে খুন করা হয়।

পুলিশি তথ্যানুসারে, নজরুল ইসলাম ও ইলিয়াস হোসেন পরস্পরের বন্ধু। নজরুল পেশায় একজন সিএনজি অটোরিকশার চালক এবং ইলিয়াস একজন মিনিবাস চালক। অন্যদিকে, অভিযুক্ত শিমুল ও তাঁর ভাই পীযূষ দুজনেই কুমিরা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ডাম্পিং স্টেশনে প্রহরীর কাজ করেন।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, নজরুলের সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাতায়াত করতে গিয়েই চন্দনার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। এই সম্পর্কের বিষয়টি জানার পর স্বামীর সঙ্গে চন্দনার বিরোধ তৈরি হয়। আর এই বিরোধের জের ধরেই শিমুল ও নজরুল তাঁকে ডেকে নিয়ে হত্যা করেন, যাতে নজরুলের বন্ধু ইলিয়াসও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।