‘আমি গরিব হলে কী হবে। তোকে তো সোনা দিয়ে মুড়িয়ে রেখেছি। কোনো দিন ফুলের টোকাও লাগতে দিইনি। বুকের ভেতর আগলে রেখেছি। তোকে কীভাবে কষ্ট দিয়ে মারল তারা।’
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে মেয়ের নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে এই করুণ আর্তনাদ করছিলেন বাবা তেজেন্দ্র দাশ। তাঁর পাশে ভেঙে পড়েছেন মা আলো বালা দাশ। অ্যাম্বুলেন্সের জানালার কাঁচ দিয়ে বারবার মেয়ের লাশের দিকে তাকিয়ে স্বজনদের কাছে আহাজারি করছিলেন তাঁরা। তাঁদের এই বুকফাটা কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো থানা প্রাঙ্গণের পরিবেশ। আজ শুক্রবার বিকেলে সীতাকুণ্ড থানা এলাকায় এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায়।
নিহত তরুণীর পরিচয় পাওয়া গেছে, তাঁর নাম চন্দনা রানী শীল (২২)। তিনি সীতাকুণ্ড উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ-পশ্চিম সৈয়দপুর এলাকার তেজেন্দ্র দাশের কন্যা। আজ সকালে উপজেলার বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের টেরিয়াইল এলাকায় টেরিয়াইল উচ্চবিদ্যালয়ের পেছন থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তাঁর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
লাশ উদ্ধারের পর সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে চন্দনার পরিবারের সদস্যরা তাঁকে শনাক্ত করেন। পরবর্তীতে মা-বাবা থানায় গিয়ে মেয়ের মরদেহ শনাক্ত করেন।
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, নিহত চন্দনার স্বামীর নাম শিমুল শীল, যিনি সীতাকুণ্ডের কুমিরা ইউনিয়নের বড় কুমিরা এলাকার বাসিন্দা। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শিমুলসহ তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। নিহত চন্দনার পরিবারের দাবি, যৌতুকের দাবিতে দীর্ঘদিনের নির্যাতনের পর তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক বছর আগে প্রেমের সম্পর্কের পর শিমুল ও চন্দনার বিয়ে হয়। তবে বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে চন্দনাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ পরিবারের। ঘটনার আগের দিনও নির্যাতনের শিকার হয়ে চন্দনা তাঁর বাবার বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু পরে স্বামী তাঁকে আবারও ডেকে নিয়ে যান। আর তার একদিন পরেই পরিবারের সদস্যরা তাঁর মৃত্যুর খবর পান।
সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আলমগীর মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “শুক্রবার সকালে টেরিয়াইল উচ্চবিদ্যালয়ের পেছনে এক নারীর লাশ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে।” তাঁর ধারণা, ওই নারীকে অন্য কোথাও হত্যা করার পর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে বিদ্যালয় এলাকার একটি জমিতে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছিল।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সীতাকুণ্ড থানার উপপরিদর্শক (এসআই) উত্তম কুমার রাজবংশী মুক্তকণ্ঠকে জানান, ঘটনার তদন্ত চলছে। এই হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছেন পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চন্দনার স্বামীসহ তিনজনকে আটক করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে গ্রেপ্তার দেখানো হবে। তবে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে যৌতুক নাকি অন্য কোনো কারণ রয়েছে, তা তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না বলে তিনি জানান।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, লাশ উদ্ধারের পর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে।