আগের দিন করা কিছু পরীক্ষার রিপোর্ট দেখাতে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা ছিল আমার। ডাক্তার আমাকে রাত ৮টার সময় দিয়েছিলেন। তবে ঢাকার চিরচেনা যানজটের কথা মাথায় রেখে আমি বেশ আগেভাগেই রওনা হয়েছিলাম।
গন্তব্যে নামার সময় রিকশাওয়ালা মামাকে ২০০ টাকার একটি নোট দিই। তিনি পুরো টাকাটাই রেখে দিলেন। আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, ভাড়া কি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেল?
আমার রাগী চেহারার দিকে তাকিয়ে রিকশাওয়ালা মামা বলে উঠলেন, “দ্যাখেন মামা, রাগ কইরেন না। অনেক দূর ঘুইরা আছি। তার ওপর বৃষ্টি। এক নাকের ওপর হাত দিয়া অন্য নাকে শ্বাসটান দ্যান, দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। আমার ‘সিচ্যুশনটা’ বোঝার চেষ্টা করেন। দেখবেন রাগ নাইমা যাইবো। গেলাম।”
এই কথা বলেই তিনি দ্রুত রিকশা চালিয়ে চলে গেলেন।
ঘড়িতে তখন কাঁটায় কাঁটায় রাত ৮টা। কিন্তু ডাক্তার তখনও আসেননি। ডাক্তার না আসা এক কথা, কিন্তু তাঁর ডান হাত হিসেবে পরিচিত কম্পাউন্ডারের ডেস্কটিও তখন শূন্য ছিল। এই বয়সে এসে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করাটা বেশ কষ্টকর। তাই আমি কোনোমতে একটি জায়গা খুঁজে বসলাম।
প্রায় বিশ মিনিট মোবাইলে রিল দেখার পর একটি রিল ফরোয়ার্ড করতে গিয়ে খেয়াল করলাম, ডাক্তার এখনও আসেননি। তবে আশার কথা হলো, কম্পাউন্ডার এসেছেন। তাঁর চেহারার ভাব দেখে মনে হচ্ছিল, বাড়িতে কারও সাথে ঝগড়া করে তিনি খুব বাজেভাবে হেরে গেছেন। আমার মনে হলো, আমি সামনে গেলেই হয়তো তিনি আমাকে ঝাড়ি দেবেন। তাই কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে প্রথমে দু-একটি কাশি দিলাম। কিন্তু তাঁর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এরপর আমি আরও জোরে কাশি দিলাম।
তখনই তিনি বিরক্ত হয়ে বলে উঠলেন, “আরে আরে! কী সমস্যা? রোগ আমারেও বান্ধাই দিবেন নাকি?”
আমি আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলাম, “ইয়ে মানে... ডাক্তার কখন আসবে?”
তিনি সংক্ষিপ্ত উত্তরে বললেন, “জানি না।”
আমি অনুরোধ করলাম, “ফোন দেন না একটা? আমাকে ৮টায় আসতে বলেছিলেন। এখন ৮টা ৪০ বাজে।”
তার উত্তরে তিনি বললেন, “ফোনে ব্যালেন্স নাই।”
মুহূর্তের জন্য আমার মুখে অনেক কথা এল, কিন্তু আমি সেগুলো গিলে নিলাম। রিকশাওয়ালার কথা মনে করে এক নাকের ওপর হাত দিয়ে অন্য নাকে শ্বাস নিলাম। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, “আমার সিচুয়েশনটা বোঝার চেষ্টা করেন। আমি থাকি ঢাকার বাইরে। এসেছি শুধু এই ডাক্তারের জন্য।”
মনে হলো কম্পাউন্ডারের মন কিছুটা নরম হয়েছে। তিনি ফোনটি বের করে বললেন, “বিশ টাকা দেন, ফ্লেক্সি!”
মুহূর্তের জন্য আমার মনে হলো হাসান মাহমুদের মতো একটি ফার্স্ট বল করে তাঁর নাক ফাটিয়ে দিই। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের মতো শান্তভাবে বললাম, “ডাক্তারের নম্বর দেন, আমি কল দিচ্ছি।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই কম্পাউন্ডারের ফোন বেজে উঠল। ওপাশ থেকে ভেসে এল ডাক্তারের কণ্ঠ, “হ্যালোওও... কী? হ, টাকা আছে ফোনে! ক্যা? আপনি নিজে ফোন দিতে পারেন না? আপনাকে ক্যান ফোন দিয়া মনে করাইতে হইবো যে আসেন, রোগীরা অপেক্ষা করতেছে?”
বিশ্বাস করুন রাসেল ভাই, ডাক্তার আসার আগেই রোগীর সব রাগ কম্পাউন্ডারের ওপর গিয়ে প্রশমিত হয়ে গেল। তবে বোঝা গেল, কম্পাউন্ডার যেমন, তাঁর ডাক্তারও ঠিক তেমন।
রাত তখন ৯টা। আমি মনে মনে আক্ষেপ করছিলাম যে, গ্রামের ডিসপেনসারির চিকিৎসা ছেড়ে কেন এখানে এলাম। এখন নিজের অবস্থাই খুব করুণ। হঠাৎ পাশে হুইলচেয়ারে বসে থাকা এক বয়োজ্যেষ্ঠ দাদি আমাকে ইশারা করে ডাকলেন। কাছে যেতেই তিনি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, “দেশ স্বাধীন হইছে কত বছর হইলো?”
আমি বেশ অবাক হলাম। আমি একজন স্মার্ট ও শিক্ষিত মেয়ে, কিন্তু মুখে মুখে বিয়োগফল করতে পারি না—এই দুর্বলতা যেন কিছুতেই প্রকাশ না পায়। তাই একটু পাশে সরে গিয়ে দ্রুত মোবাইলে হিসাব করে বললাম, “৫৫ বছর প্রায়। কিন্তু এই প্রশ্ন…?”
দাদির বুক হঠাৎ টানটান হয়ে গেল। সামনে বসে গল্প করা দুই মুরব্বির দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “সেই ৫৫ বছর আগে দ্যাশ স্বাধীন হইছে, কই! এখনো তো ডাক্তারের সিরিয়ালটাই ঠিক হয় নাই!”
এরপর শুরু হলো দাদির একক বক্তৃতা। তিনি একের পর এক দেশ ও জাতিসংক্রান্ত দুর্দান্ত সব প্রশ্ন তুলে সেই মুরব্বিদের কাবু করে ফেলছিলেন। মনে হচ্ছিল, তিনি এই বাক্যুদ্ধে নিশ্চিতভাবে জিতে যাবেন। আমার মনে হলো, ডাক্তার না এলেও অন্তত একটি বিতর্ক প্রতিযোগিতা দেখে যেতে পারব।
ঘড়িতে তখন রাত ১০টা ১৫ মিনিট। কম্পাউন্ডার ঝিমোতে শুরু করেছেন, আর আমি অস্থির হয়ে পায়চারি করছিলাম। হঠাৎ কম্পাউন্ডারের চিৎকার শোনা গেল, “আইতাছে! আইতাছে!”
আমি দ্রুত দৌড়ে গিয়ে চেম্বারের দরজার সামনে দাঁড়ালাম। দেখলাম, ডাক্তার হেলেদুলে ভেতরে ঢুকছেন। সিরিয়াল অনুযায়ী অবশেষে আমার ভেতরে ঢোকার সুযোগ হলো। রিপোর্ট দেখার পর স্যার বললেন, “তেমন কিছুই করার নেই।”
আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। ভাবলাম, আমি কি তবে আর বেশিদিন বেঁচে নেই? নারী এশিয়া কাপ ক্রিকেট ফাইনাল পর্যন্ত কি টিকব, নাকি তার আগেই শেষ হয়ে যাব?
আমি আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “স্যার! আমার হাতে আর কয় দিন আছে? কী এমন সমস্যা? সত্যিটা বলেন!”
স্যার অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আরে না! টেস্ট দেওয়ার মতো কিছু পাচ্ছি না। এ মাসের টার্গেটটা বোধ হয় ফুলফিল হবে না। আপনার স্পন্দন একটু কম, কিছু গ্যাসের সমস্যা আছে। নার্ভ উত্তেজিত হয় এমন কাজ করবেন। যেমন বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা দেখতে পারেন। সংসদ অধিবেশন দেখতে পারেন, ঢাকার জ্যামে বসে থাকতে পারেন।”
আমার মনে হলো আমি যেন নতুন জীবন ফিরে পেলাম। মৃত্যুর দুয়ার থেকে এমন কামব্যাক কি আর্জেন্টিনা ছাড়া আর কারও সম্ভব?
চেম্বার থেকে বের হওয়ার সময় মনে হলো, স্যার আমাকে এত ভালো কথা বললেন, বিনিময়ে আমারও কিছু বলা উচিত। সিনেমার নায়িকাদের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে আমি বললাম, “স্যার, আপনার পেট অনেক ফুলে আছে। আমারও এমন হয়। গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ নিয়মিত খাবেন আর সকালে খালি পেটে মেথি খাবেন। আশা করি, এই সাজেশনে ঠকবেন না। আসি” বলে মুচকি হেসে বেরিয়ে এলাম। ডাক্তার চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
দরজার বাইরে একজন জিজ্ঞেস করলেন, “ভিতরে কীসের ডাক্তার?”
তখনই আমার খেয়াল হলো, আমি তো ডাক্তারের বিভাগই জানতাম না। সাইনবোর্ডের দিকে তাকিয়ে দেখলাম লেখা— “লিভার, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ।”
আমি কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি নিজেই গ্যাস্ট্রোর ডাক্তার! রিকশাওয়ালা মামা ঠিকই বলেছিলেন— সিচুয়েশন বুঝতে আমার সব সময়ই যে কেন দেরি হয়!