গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সব ধরনের জ্বালানির দাম একলাফে লিটারে কুড়ি টাকা করে বৃদ্ধি করা হয়েছে। অর্থনীতির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম এভাবে বাড়ানো খুব একটা প্রয়োজন ছিল না। বিশেষ করে গত এক থেকে দেড় মাসে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমে আসার যে ইতিবাচক লক্ষণ অর্থনীতিতে দেখা যাচ্ছিল, জ্বালানির দামের এই আকস্মিক উল্লম্ফনের ফলে তা বাধাগ্রস্ত হবে অথবা মূল্যস্ফীতি পুনরায় বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান কমানোর জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে যে যুক্তি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দিয়েছেন, তাকে খোদ খোদ অজুহাতের চেয়ে বেশি কিছু বলা যায় না।
মুক্তকণ্ঠর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরের সময়কালে মাত্র এক বছর বাদে বিপিসির মুনাফা ইতিবাচক পর্যায়ে ছিল। এই ১০ বছরে বিপিসির নিট মুনাফার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। এর বিপরীতে কেবল ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে গত কয়েক মাসে বিপিসি লোকসানের মুখে পড়েছে। এছাড়া সরকার জ্বালানি খাতে প্রায় ৩১ শতাংশ হারে শুল্ক ও কর ধার্য করে আসছে। দাবি করা হচ্ছে যে, এবারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে বিপিসির লোকসান ১০ হাজার কোটি টাকা কমবে। সরকার যদি এই মূল্যবৃদ্ধির বিকল্প হিসেবে জ্বালানি খাতের শুল্ক-কর সামান্য হ্রাস করত, তবে অতি সহজেই এই মূল্যবৃদ্ধি এড়ানো সম্ভব হতো।
সরকারের দাবি, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানির দাম কম থাকায় চোরাচালানের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। তবে এই দাবিটি অযৌক্তিক বলে মনে হয়, কারণ ভারতের কলকাতায় ডিজেলের দাম বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম। বাংলাদেশে মূল্যবৃদ্ধির পর ডিজেলের দাম ১৫৫ টাকায় পৌঁছেছে, অথচ কলকাতায় এক লিটার ডিজেলের দাম ভারতীয় রুপিতে ৯৯.৫ রুপি, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১২৮ টাকা। সম্প্রতি সরকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার ফলে বর্তমান অর্থবছরে সরকারি ব্যয় ৩৭ হাজার কোটি টাকার বেশি বাড়বে। জ্বালানির দাম বাড়ানোর পেছনে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধিকে একটি প্রভাবক হিসেবে বিবেচনা করা হলে কি ভুল হবে?
যদি সোলার পাওয়ার বা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে যথাযথ অগ্রাধিকার দেওয়া হতো, তবে আমদানি করা তেল এবং এলএনজির আন্তর্জাতিক দামের ওঠানামার অজুহাতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন হতো না।
বাংলাদেশ সরকারের জ্বালানি নীতির অন্যতম বড় ত্রুটি হলো আমদানি করা তেল ও এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। উদাহরণস্বরূপ, পাকিস্তানে সোলার এনার্জি উৎপাদন ইতিমধ্যেই ছয় হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে, যা ওই দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশের বেশি। ভারতে সোলার পাওয়ার উৎপাদন ৭০ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে। বিপরীতে বাংলাদেশে সোলার এনার্জি উৎপাদন এখনো ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটের নিচে। আমাদের অনেক নীতিনির্ধারকের ধারণা যে, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রচুর জমির প্রয়োজন হয়, তাই ভূমি-দরিদ্র বাংলাদেশে এটি সম্ভব নয়। এই ভুল ধারণাটি দূর করার জন্য আমি আমার বিভিন্ন কলামে সম্ভাব্য জমির সন্ধান দেওয়ার চেষ্টা করেছি।
সিলেট বিভাগে মোট ১৬৮টি চা-বাগান রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ চা সংসদের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্যে জানা গেছে যে, এই বাগানগুলোর মাত্র ৫০-৫২ শতাংশ জমিতে কারিগরিভাবে চা উৎপাদন সম্ভব। বাকি বড় অংশে প্রাকৃতিকভাবেই চা জন্মানো সম্ভব নয়, কারণ সেখানে সরাসরি সূর্যের আলো বেশি পড়ার ফলে চা-গাছ বাঁচতে পারে না। তাঁরা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন যে, এই ধরনের জমিতে সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুমতি দেওয়া হলে এবং লিজ-ডকুমেন্ট সংশোধন করা হলে, দুই-তিন বছরের মধ্যেই চা-বাগানগুলোতে সোলার প্যানেল বসিয়ে দেশের বিদ্যুৎ গ্রিডে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যোগ করা সম্ভব হবে।
জানা গেছে, এই প্রস্তাবটি বাংলাদেশ চা সংসদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা চরাঞ্চলসমূহ, সমুদ্র উপকূল এবং নদ-নদী ও খালের দুই পাড়ে সোলার প্যানেল স্থাপনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সীমানায় যে কয়েক শ চরাঞ্চল গড়ে উঠছে, সেগুলোতে জনবসতি গড়ে ওঠার আগেই যদি বড় বড় সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের মহাপরিকল্পনা অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়ন করা হয়, তবে আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে অত্যন্ত সাশ্রয়ী উপায়ে কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।
সম্প্রতি জার্মানি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে বাংলাদেশকে বিপুল আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা গেছে। জমির স্বল্পতার প্রকৃত সমাধান পাওয়া যাবে যদি দেশের বিশাল সমুদ্র উপকূলে একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়।
জার্মানি সমুদ্র উপকূলের কথা বললেও আমি বঙ্গোপসাগরে নতুন জেগে ওঠা চরাঞ্চলগুলোকে অধিক সম্ভাবনাময় মনে করি। যেহেতু সেখানে কোনো মানববসতি নেই, তাই ভূমি অধিগ্রহণের কোনো ঝামেলা হবে না। উপরন্তু, উৎপাদিত বিদ্যুৎ সাবমেরিন কেব্লের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডের গ্রিডে নিয়ে আসা খুব বেশি ব্যয়সাধ্য হবে না। সোলার পাওয়ার উৎপাদনে যথাযথ অগ্রাধিকার দিলে আমদানি করা তেল এবং এলএনজির আন্তর্জাতিক দামের ওঠানামা সামাল দেওয়ার অজুহাতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন পড়ত না।
— ড. মইনুল ইসলাম, অর্থনীতিবিদ এবং অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়