ব্যাংকিং খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছরে জাতীয় বাজেট থেকে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।

আজ শনিবার রাজধানীর মাদানি অ্যাভিনিউয়ের ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে (ইউআইইউ) ওয়ান ব্যাংক আয়োজিত বাংলা কিউআরের প্রচারণামূলক অনুষ্ঠানে ব্যাংক খাতের ক্ষতির প্রসঙ্গে এ কথা বলেন গভর্নর।

অনুষ্ঠান শেষে প্রশ্নোত্তর পর্বে এক শিক্ষার্থী জানান, তাঁর বাবা নির্দিষ্ট একটি ব্যাংকের শাখা ও এটিএম থেকে প্রয়োজনীয় টাকা তুলতে পারেননি। ব্যাংক টাকা দিতে পারেনি। তাঁর টিউশন ফি দেওয়ার সময়েও এমন সমস্যায় পড়তে হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে কী ব্যবস্থা নিয়েছে?

জবাবে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘আমি যখন দায়িত্ব নিই, তখন দেখলাম, ব্যাংকের তিন ভাগের এক ভাগ টাকা চুরি করে নিয়ে গেছে কিছু লোক। এটা ঠিক চুরি বলা যাবে না; বরং বলা ভালো, এটা লুট হয়েছে। ব্যাংকের টাকা লুট থেকেই আর্থিক খাতের সমস্যার শুরু। এটি এখন আমাদের অন্যতম প্রধান সমস্যা।’

বাংলাদেশ ব্যাংক এখন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে অর্থ সরবরাহ করে গ্রাহকদের টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করছে বলে জানান গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, এটা জনগণের করের টাকা দিয়েই করা হচ্ছে।

লুটপাটের কারণে ব্যাংক খাতের যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে পরবর্তী পাঁচ থেকে আট বছরে জাতীয় বাজেট থেকে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে জানান গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, গত সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ–সংক্রান্ত খসড়া প্রস্তাব সরকারের কাছে দেওয়া হয়েছে।

মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘এই পরিমাণ (৬০ হাজার কোটি) টাকা দিয়ে বছরে দুই কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা করা যেত অথবা দুটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা যেত। যে টাকা লুট হয়েছে, সেটা জনগণের টাকা। আবার এই জনগণকেই এখন সেই টাকা ফেরত দিতে হবে। লুট করে নিয়ে গেল একজন, এখন জরিমানা দিচ্ছেন আপনি, আমি। এই কথাগুলো এ জন্য বলছি যে আমাদের সমাজে এ নিয়ে সচেতনতা থাকা দরকার।’

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ওয়ান ব্যাংক জানায়, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে ‘বাংলা কিউআর’ সেবা চালু করেছে ওয়ান ব্যাংক। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে সহজ, সুবিধাজনক ও আন্তব্যবহারযোগ্য ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে। এই সেবা চালু উপলক্ষে এ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে আরও অতিথি ছিলেন ইউআইইউর উপাচার্য মো. আবুল কাশেম মিঞা ও ওয়ান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহিত রহমান।

অনুষ্ঠানে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক একীভূত হওয়া ব্যাংকটিকে (সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক) পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। ব্যাংকটি এখন গ্রাহকদের সব ধরনের টাকা তোলার অনুরোধ মেটাতে সক্ষম। ১৫ অক্টোবর থেকে ন্যাশনাল ব্যাংকও সব গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ করতে পারবে।

মোস্তাকুর রহমান আরও বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন, আমরা আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নীতি গ্রহণ করেছি। আমরা চাচ্ছি, ব্যাংক ও ঋণখেলাপি নিজেরাই আলোচনা করে বিষয়টি ফয়সালা করে নিক। যদি তারা তা না করে, তবে ২০২৭ সাল থেকে সবাইকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। আমরা এ লক্ষ্যে দুটি আইন সংশোধন করছি এবং মানি লন্ডারিং রোধের নিয়মাবলি আরও কঠোর করছি।’

গভর্নর জানান, সরকার ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা আগের লক্ষ্যের চেয়ে দুই লাখ কোটি টাকা বাড়িয়েছে। সারা দেশে বাংলা কিউআর পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব। দেশে বর্তমানে কর–জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে। বাংলা কিউআর পুরোদমে চালু হলে এই অনুপাত ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো লেনদেনের তথ্য পুরোপুরি নথিবদ্ধ করে না। রাজস্ব–জিডিপির অনুপাত কমে যাওয়ার এটা একটা কারণ বলে উল্লেখ করেন মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, কিউআর পেমেন্টের ব্যবস্থা এসব লেনদেনকে আনুষ্ঠানিক হিসাব পদ্ধতির আওতায় নিয়ে আসবে।

সন্দেহজনক লেনদেনে কিউআর কোড ব্যবহারের আশঙ্কা নিয়ে গভর্নর বলেন, এ ধরনের লেনদেন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও ব্যাংকিং খাতের মাধ্যমেও ঘটে। সব কটি মাধ্যমেই সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে বলে তিনি জানান।

অনুষ্ঠানে ওয়ান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহিত রহমান বলেন, ‘ডিজিটাল রূপান্তর তখনই সার্থক হয়, যখন দৈনন্দিন জীবনে আর্থিক সেবা আরও সহজ ও সুলভ হয়। ইউআইইউয়ে বাংলা কিউআর চালু করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সরাসরি ইন্টারঅপারেবল ডিজিটাল পেমেন্টের অভিজ্ঞতা পাবেন। পাশাপাশি ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন হতে পারবেন।’