সকালে ঘুম ভাঙার পর কি কখনো খেয়াল করেছেন যে আপনার চোয়ালে বেশ ব্যথা করছে? কিংবা দাঁতগুলোতে কেমন যেন একটু অস্বস্তি লাগছে? এই সমস্যা অনেকেরই হয়। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে অজান্তেই যে অনেকে দাঁত কিড়মিড় করেন, তা হয়তো তারা টেরই পান না।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই সমস্যাকে বলা হয় ‘ব্রুক্সিজম’। এটি কেবল ঘুমের ভেতরকার একটি সাধারণ অভ্যাসই নয়, এর পেছনে শারীরিক ও মানসিক নানা কারণ দায়ী থাকে। চলুন, জেনে নেওয়া যাক কেন মানুষ ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড় করে, এর ফলে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে এবং এর থেকে মুক্তির উপায়ই বা কী-

ঘুমের মধ্যে কেন দাঁত কিড়মিড় করে?

ঘুমের সময় মানুষ কেন দাঁতে দাঁত ঘষে বা চেপে ধরে- এ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন কারণের কথা বলেছেন। এর মধ্যে প্রধান কারণগুলো হলো-

• মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা: সারাদিনের কাজের চাপ, ব্যস্ততা কিংবা মানসিক টানাপোড়েন অনেক সময় আমাদের অবচেতন মনে প্রভাব ফেলে। আপনি যখন প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকেন, তখন শরীর ঘুমের মধ্যেও সেই চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করে। আর তখনই চোয়ালের পেশিগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে।

• স্নায়ুতন্ত্রের সাথে সম্পৃক্ততা: আমাদের চোয়াল ও স্নায়ুতন্ত্র খুব ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। আমরা যখন কোনো কারণে মানসিক চাপে থাকি, শরীর তখন ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ মোডে চলে যায়। ফলে পেশিগুলো টানটান হয়ে যায়। এতে অজান্তেই দাঁতে দাঁত চেপে বসার প্রবণতা তৈরি হয়।

• ঘুমের সমস্যা: রাতের বেলা অনেকেরই ঠিকমতো শ্বাস নিতে সমস্যা হয় (যেমন অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া)। তাদের শরীর স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস বজায় রাখার চেষ্টা হিসেবেও দাঁত কিড়মিড় করতে পারে।

কিছু ইতিবাচক দিকও আছে কি?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রুক্সিজমের যে সবসময় খারাপ দিকই থাকে তা কিন্তু নয়। চোয়ালের পেশি নড়াচড়া করলে লালাগ্রন্থিগুলো সক্রিয় হয়, যা মুখ পরিষ্কার রাখতে এবং হজমে সাহায্য করে। এ ছাড়া এটি মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাড়াতেও কিছুটা ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে সমস্যা যখন মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, তখন তা আর ইতিবাচক থাকে না। এই সমস্যা অনেক বেড়ে গেলে দ্রুত ডাক্তার দেখানো উচিত।

কীভাবে বুঝবেন আপনার ব্রুক্সিজমের সমস্যা আছে?

অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, এই সমস্যা তো ঘুমের মধ্যে হয়, তাহলে বুঝবেন কী করে আপনার দাঁত কিড়মিড় করে কিনা। যেহেতু বেশিরভাগ মানুষই ঘুমের মধ্যে এই কাজ করেন, তাই শুরুতে অনেকেই বিষয়টি বুঝতে পারেন না। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখলে সতর্ক হওয়া দরকার-

• সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরপরই মাথা, মুখ কিংবা চোয়ালে তীব্র ব্যথা অনুভব করা।

• চোয়াল শক্ত হয়ে থাকা বা মুখ খুলতে একটু কষ্ট হওয়া।

• আয়নায় দেখলে মনে হওয়া যে দাঁতগুলোর উপরিভাগ কেমন যেন ক্ষয়ে বা চ্যাপ্টা হয়ে গেছে।

• ঠান্ডা বা গরম কিছু খেলে দাঁতে শিরশির অনুভূত হওয়া।

• রাতে ঠিকমতো ঘুম না হওয়া এবং সারাদিন একটা ক্লান্তি লেগেই থাকা।

এটি কি শরীরের বড় কোনো ক্ষতি করতে পারে?

প্রাথমিকভাবে দাঁত কিড়মিড় করলে শরীরের তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। তবে দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যাকে অবহেলা করলে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। দাঁতের উপরিভাগের যে শক্ত আবরণ বা এনামেল থাকে, তা ক্ষয়ে যেতে পারে। অনেক সময় অতিরিক্ত চাপের কারণে দাঁত ভেঙে যাওয়ার যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। এমনকি সমস্যা অনেক বাড়ার ফলে চোয়ালের পেশি ফুলে গিয়ে মুখের আকৃতিতেও কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে।

এই সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে কীভাবে?

ব্রুক্সিজম বা দাঁত কিড়মিড় করার সমস্যা পুরোপুরি দূর করতে হলে এর মূল কারণ খুঁজে বের করতে হবে। জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনলে এবং সঠিক চিকিৎসা নিলে এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।

• মাউথগার্ড ব্যবহার: দন্তচিকিৎসকের কাছে গেলে তারা সাধারণত রাতে ঘুমানোর সময় পরার জন্য একটি বিশেষ কাস্টমাইজড মাউথগার্ড বা স্প্লিন্ট দিয়ে থাকেন। এটি দাঁতের সঙ্গে দাঁতের ঘষা লাগতে দেয় না এবং দাঁত সুরক্ষিত রাখে।

• স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট বা মানসিক চাপ কমানো: যেহেতু মানসিক চাপ এর অন্যতম বড় কারণ, তাই জীবনযাত্রায় একটু পরিবর্তন আনা জরুরি। নিয়মিত হালকা ব্যায়াম, মেডিটেশন বা পছন্দের কোনো কাজ করার অভ্যাস মনের চাপ কমাতে সাহায্য করে।

• জীবনযাত্রায় পরিবর্তন: অতিরিক্ত ক্যাফেইন, অ্যালকোহল বা ধূমপানের অভ্যাস থাকলে তা কমিয়ে ফেলতে পারেন। এগুলো অনেক সময় ঘুমের মান খারাপ করে এবং পেশির টান বাড়িয়ে দেয়।

• চিকিৎসকের পরামর্শ: সমস্যা যদি খুব বেশি গুরুতর হয়, তবে চিকিৎসকরা অনেক সময় চোয়ালের পেশি শিথিল করতে বোটক্স ইনজেকশন বা প্রয়োজনীয় থেরাপির পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এছাড়া সমস্যাটি স্লিপ অ্যাপনিয়ার কারণে হলে সেটির আলাদা চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

আপনার যদি সকালে ঘুম ভাঙার পর নিয়মিতভাবে চোয়ালে বা মাথায় ব্যথা করে, তবে বিষয়টি এড়িয়ে না গিয়ে একজন ভালো ডেন্টিস্ট বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। নিজের শরীরের ছোটখাটো সংকেতগুলো সময়মতো বুঝতে পারলে বড় ধরনের জটিলতা থেকে সহজেই মুক্ত থাকা সম্ভব।

সূত্র: বিবিসি বাংলা