শুভ মহালয়া উপলক্ষে খাগড়াছড়ি কেন্দ্রীয় লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দিরে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথমবারের মতো এই মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয়েছে জীবিত মায়ের পূজা। মূলত মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং সন্তানের দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার লক্ষ্যেই এই বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এই অনন্য আয়োজনে অংশ নিয়েছেন অর্ধশতাধিক মা ও তাঁদের সন্তান।
আয়োজকদের বিশ্বাস, এই ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মাতৃভক্তি বৃদ্ধি পাবে এবং তারা অন্যায় ও অপকর্ম থেকে দূরে থাকতে অনুপ্রাণিত হবে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে খাগড়াছড়ি কেন্দ্রীয় লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দিরে চণ্ডীপাঠ এবং দেবী দুর্গার আহ্বানমন্ত্রের মাধ্যমে মহালয়ার ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এই সময়ে ভক্তরা দেবীর চরণে ১০৮টি পদ্মফুল অর্পণ করে পূজা-অর্চনা করেন। নিজেদের ও পরিবারের মঙ্গলের পাশাপাশি তারা দেশ ও জাতির শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।
তবে এবারের মহালয়ার আনুষ্ঠানিকতার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল জীবিত মায়ের পূজা। মন্দির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মাকে শ্রদ্ধা জানানো এবং তার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যেই প্রথমবারের মতো এই আয়োজন করা হয়েছে। এই গর্ভধারিণী মায়ের পূজায় অর্ধশতাধিক মা ও সন্তান অংশ নেন। অনুষ্ঠানে সন্তানরা তাঁদের মায়ের আশীর্বাদ নেন এবং মায়েরা সন্তানদের মঙ্গলের জন্য দোয়া ও আশীর্বাদ করেন।
জীবিত মায়ের পূজায় অংশ নেওয়া সন্তান সুজন দে বলেন, “মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশের এমন আয়োজন সত্যিই প্রশংসনীয়। এ ধরনের উদ্যোগ নতুন প্রজন্মকে মায়ের প্রতি আরও শ্রদ্ধাশীল হতে শেখাবে এবং ভালো পথে চলতে উৎসাহিত করবে।”
আরেক সন্তান পুষ্পিতা দাশ বলেন, “মায়ের প্রতি ভালোবাসা শুধু একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। প্রতিটি সন্তানের উচিত, জীবিত অবস্থায় মাকে সম্মান করা, তার যত্ন নেওয়া এবং তার আশীর্বাদ নিয়ে চলা।”
পূজায় অংশ নেওয়া মা নমিতা দে বলেন, “সন্তানদের নিয়ে এমন একটি আয়োজনে অংশ নিতে পেরে ভালো লাগছে। সন্তানদের মঙ্গল কামনা করে আশীর্বাদ করেছি। এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে মা ও সন্তানের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে বলে আশা করি।”
আরেক মা শেলী রাণী বলেন, “সন্তানদের জীবনে মায়ের অবদান অপরিসীম। সন্তানরা যেন সব সময় মাকে সম্মান করে, ভালোবাসে এবং সৎ পথে চলে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। এমন আয়োজনের জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাই। আশা রাখব, প্রতিবছর এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত থাকবে।”
মহালয়া পূজা উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব বিজয় দেব বলেন, “পিতৃপক্ষ শেষ হয়ে আজ শুভ মহালয়ার মধ্য দিয়ে মাতৃপক্ষের সূচনা হয়েছে। তাই আমাদের এই ধরনের ব্যতিক্রমী আয়োজন। আমরা মনে করি, মায়ের মধ্যেই রয়েছে সব দেবতার অধিষ্ঠান। সন্তানরা যদি জীবিত মাকে শ্রদ্ধা ও ভক্তির সঙ্গে ভালোবাসে, তাহলে তাদের মধ্যে মাতৃভক্তি বাড়বে। একই সঙ্গে তারা অন্যায় ও পাপকাজ থেকেও দূরে থাকবে। এতে মা ও সন্তানের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে এবং ভবিষ্যতে আর কোনো মাকে সন্তানরা বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাবে না।”
আয়োজকরা আরও জানান, মহালয়া উপলক্ষে এই বিশেষ দিনে খাগড়াছড়ি কেন্দ্রীয় লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দিরে বিকেলে অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ এবং সন্ধ্যায় ধর্মীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী চলবে মহালয়ার বিভিন্ন ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা।
জীবিত মায়ের প্রতি সন্তানদের ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। আয়োজকদের প্রত্যাশা, জীবিত মাকে সম্মান ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে সন্তানদের মধ্যে নৈতিকতা, মানবিকতা ও মাতৃভক্তি জাগ্রত হবে।