কিছু নির্দিষ্ট স্থানের সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতি এমনভাবে জড়িয়ে থাকে যে, সেখানে প্রথম যাত্রার কথা আজীবন মনে থাকে। সেই টান মানুষকে বারবার সেই গন্তব্যে ফিরে যেতে প্ররোচিত করে। মুক্তকণ্ঠর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’-র নিয়মিত বিভাগ ‘ফিরে ফিরে যাই’-তে বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রথিতযশা ব্যক্তিরা তাদের প্রিয় ভ্রমণস্থলের স্মৃতিচারণ করেন। সেই ধারাবাহিকতায় এবার নিজের অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছেন জনপ্রিয় সংগীত পরিচালক ইমন চৌধুরী। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন সজীব মিয়া।

ইমন চৌধুরীর মতে, বাংলাদেশের মধ্যে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ভ্রমণের জায়গা দুটি—সুন্দরবন এবং বান্দরবান। তবে এই দুইয়ের মধ্যে সুন্দরবন তাঁর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়।

সুন্দরবনের যে দিকটি তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে, তা হলো সেখানকার পরিচ্ছন্নতা এবং গভীর নীরবতা। তিনি বর্ণনা করেন, রাতে আকাশের দিকে তাকালে অগণিত তারা যেন হাতের নাগালে চলে আসে এবং চাঁদকেও অনেক বড় মনে হয়। গাছ আর নদীর এক অদ্ভুত সমন্বয় সেখানে বিদ্যমান। সুন্দরবনের সেই নিস্তব্ধতাকে তিনি ‘পিনড্রপ সাইলেন্স’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

সংগীত পরিচালক মনে করেন, সুন্দরবনে গেলে মানুষ মূলত বনের নিয়ন্ত্রণেই চলে যায়। জোয়ার-ভাটার নিয়ম থেকে শুরু করে কোথায় যাওয়া যাবে, সবকিছুর জন্য বনের অনুমতি প্রয়োজন হয়। এই বৈশিষ্ট্যই সুন্দরবনকে তাঁর কাছে রহস্যময় করে তুলেছে, কারণ এখানকার রূপ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়।

সুন্দরবনের প্রতি তাঁর এই অনুরাগ দীর্ঘদিনের। তিনি বলেন, “প্রথম গিয়েছিলাম ২০০৫ সালে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ বার যাওয়া হয়েছে। এ বছরও আশা করছি অক্টোবর বা নভেম্বরে যাব।”

সুন্দরবন ভ্রমণ নিয়ে তাঁর অনেক গল্প এবং রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতা রয়েছে। এমনকি কয়েকবার বাঘের মুখোমুখিও হয়েছেন তিনি। এর মধ্যে ডিমের চরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা তিনি বিশেষভাবে স্মরণ করেন।

সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, ডিমের চরে যাওয়ার পর সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। অন্য পর্যটকরা সেখান থেকে চলে গেলেও ব্যক্তিগত লঞ্চ থাকায় তাঁরা আরও কিছুক্ষণ সেখানে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। তখন আকাশে চাঁদ উঠেছিল এবং চারপাশ দিনের মতো আলোকিত ছিল, যার ফলে সময়ের কথা তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন। যখন লঞ্চে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তাঁদের সাথে থাকা গার্ড বারবার সতর্ক করে বলছিলেন, “ভাই, চলেন, চলেন।”

প্রকৃতির মায়ায় মোহিত হয়ে ফিরতে দেরি করছিলেন তাঁরা। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ নাকে এক অদ্ভুত গন্ধ পান তিনি, যা থেকে তিনি বুঝতে পারেন যে আশেপাশে বাঘ রয়েছে। দ্রুত তিনি কয়েকটি ছবি তোলেন, যার মধ্যে তাঁর স্ত্রীর একটি ছবিও ছিল। এরপর দ্রুত লঞ্চের দিকে ফিরে আসেন। পরে ছবিগুলো জুম করে দেখার পর তিনি লক্ষ্য করেন, বেশ দূরে একটি সোজা অবয়বের মতো কিছু দাঁড়িয়ে আছে। উপস্থিত সবাই নিশ্চিত করেন যে সেটিই ছিল বাঘ।

ভ্রমণপিপাসু হিসেবে তিনি আশপাশের অনেক পরিবর্তন হয়তো সবসময় খেয়াল করেন না, তবে একটি বিষয় তাঁর নজরে এসেছে। তিনি লক্ষ্য করেছেন, এখন মানুষ বাঘের ব্যাপারে আগের চেয়ে অনেক বেশি আতঙ্কিত থাকে। আশপাশে বাঘের অস্তিত্ব থাকলে একটি হালকা ভয় কাজ করে, যা সাম্প্রতিক সময়ে তিনি অনুভব করেছেন।

জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে সুন্দরবনের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। তিনি জানান, সিডর ঘূর্ণিঝড়ের আগের সুন্দরবনের সঙ্গে পরের সুন্দরবনের কোনো মিল নেই। তাঁর মতে, যারা নিয়মিত সুন্দরবন ভ্রমণ করেন, তারা এই পরিবর্তনের কথা আরও স্পষ্টভাবে বলতে পারবেন।

সিডরের আগে জঙ্গলটি ছিল অত্যন্ত সুন্দর এবং অনেকটা বাগানের মতো সাজানো। কিন্তু সিডরের পর বনের অনেক পরিবর্তন হয়েছে এবং এটি এখনো পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি। অনেক অংশ এখনো ভাঙাচোরা হয়ে আছে। সুন্দরবনের ওপর দিয়ে নিয়মিত ঝড় বয়ে যাওয়ার ফলে বনটি সব সময়ই ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

দেশের বাইরে নেপাল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। স্রষ্টার কৃপায় পৃথিবীর অনেক দেশ ঘোরার সুযোগ পেলেও নেপালকেই তিনি সবচেয়ে পছন্দ করেন। তাঁর বিশ্বাস, একবার ভ্রমণে নেপালকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়; বারবার যেতে হবে তবেই এর আসল অনুভূতি উপলব্ধি করা যাবে। সুন্দরবনের পর পৃথিবীতে নেপালকেই তাঁর কাছে সবচেয়ে ইতিবাচক বা ‘গুড ভাইব’-এর জায়গা মনে হয়েছে।