বন্ধ হয়ে পড়া কলকারখানা পুনরায় চালু করা এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনতে ৬২ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এই তহবিলের আওতায় শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি এই উদ্যোগের মাধ্যমে ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, প্রণোদনা ঘোষণার চার মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও ঋণ বিতরণের প্রক্রিয়ায় কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। ফলে প্রত্যাশিত সুফল পাচ্ছে না শিল্পকারখানাগুলো; বরং জ্বালানি সংকটসহ নানা প্রতিকূলতায় ধুঁকছে তারা।

তহবিল বিতরণের এই ধীরগতির কারণে এখন শর্ত শিথিল করা এবং সুদের হার কমিয়ে ঋণ বিতরণের হার বাড়ানোর নতুন উপায় খুঁজছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই সংকট উত্তরণে এবং কার্যকর পথ খুঁজে পেতে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সাবেক ব্যাংকারদের সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থনীতিতে দ্রুত গতি ফেরাতে ১৮০ দিনের একটি নতুন পথনকশা বা রোডম্যাপ ঘোষণার কথা ভাবছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ব্যাংকের কাজ হলো ঝুঁকি বিবেচনায় ঋণ দেওয়া। পুরো ব্যাংক খাত এখন খেলাপি ঋণে জর্জরিত। এ জন্য ঋণ দেওয়ার আগে ব্যাংকগুলো এখন যথাযথ প্রক্রিয়ায় যাচাই–বাছাই করছে। যেসব বন্ধ প্রতিষ্ঠান ঋণ চায় বা দেওয়ার আলোচনা হচ্ছে, সেগুলোর পরিচালনা সক্ষমতা আছে কি না, সেটিও ব্যাংকগুলোকে বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।”

কোন খাতের জন্য কত বরাদ্দ

গত মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করে, যা পরবর্তীতে বাড়িয়ে ৬২ হাজার কোটি টাকা করা হয়। এই বিশাল অংকের ঋণের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে এবং ২১ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃ অর্থায়ন তহবিলের মাধ্যমে বিতরণের কথা। এই ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার রাখা হয়েছে ৭ শতাংশ।

তহবিলের ৪১ হাজার কোটি টাকার বিভাজন নিম্নরূপ: বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা, কটেজ, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি খাতের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা এবং রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া উত্তরবঙ্গে কৃষি কেন্দ্র বা হাব গড়ে তোলার জন্য আরও ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, ২১ হাজার কোটি টাকার পুনঃ অর্থায়ন তহবিলের আওতায় বেশ কিছু খাত চলমান রয়েছে। এর মধ্যে প্রিশিপমেন্ট ফাইন্যান্স/প্যাকিং ক্রেডিট খাতের জন্য ৭ হাজার কোটি টাকা, কুটির ও ক্ষুদ্র খাতের জন্য পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) মাধ্যমে ৫ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে ১ হাজার কোটি টাকা বিতরণের কথা। এছাড়া বেকারদের কর্মসংস্থানের জন্য কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে ১ হাজার কোটি টাকা, গ্রামীণ অর্থনীতি কর্মকাণ্ডের জন্য আনসার ভিডিপি ব্যাংকের মাধ্যমে ১ হাজার কোটি টাকা এবং পরিবেশবান্ধব খাতে অর্থায়নের জন্য ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সৃজনশীল অর্থনীতি খাতের জন্য ৫০০ কোটি টাকা ও স্টার্টআপদের অর্থায়নের জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানিকারকদের জন্য ২ হাজার কোটি টাকা এবং চামড়া ও জুতা রপ্তানি খাতে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ৬২ হাজার কোটি টাকার এই প্রণোদনা তহবিলের মধ্যে গত মাস পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। তবে এর মধ্যে সরাসরি গ্রাহকদের কাছে পৌঁছেছে এক হাজার কোটি টাকারও কম, যার মধ্যে মাত্র ৫০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বন্ধ কারখানা চালুর উদ্দেশ্যে। সিএমএসএমই, উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি এবং কৃষি খাতের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিল থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ঋণ বিতরণ করা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “অর্থনীতির গতি ফেরাতে প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করা হয়েছিল। তহবিল থেকে ঋণ বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ঋণ বিতরণের গতি বাড়াতে এবং সার্বিকভাবে আরও কোনো উদ্যোগ নেওয়ার দরকার আছে কি না, তা জানতে আমরা খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।”

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও ব্যবসায়ীদের দাবি

ঋণ বিতরণে গতি আনতে গত মঙ্গলবার দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে বেশ কয়েকজন অর্থনীতিবিদ ও সাবেক ব্যাংকারের সঙ্গেও সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সূত্রে জানা গেছে, ঋণ বিতরণের বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও সাবেক ব্যাংকাররা এক ধরনের পরামর্শ দিয়েছেন এবং ব্যবসায়ী নেতারা দিয়েছেন ভিন্ন ধরনের প্রস্তাব।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “কম সুদের এই ঋণ যথাযথ প্রক্রিয়া ও যোগ্যদের দিতে হবে। ব্যাংকারদের দায়িত্ব দেখেশুনে এই ঋণ দেওয়ার। শুধু বিতরণের জন্য ঋণ বিতরণ করলে তা ব্যাংক খাতে নতুন করে বিপদ ডেকে আনবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ বিতরণে চাপ না দিয়ে তদারকি বাড়াতে পারে, যাতে প্রণোদনার ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয়।”

অন্যদিকে, ব্যবসায়ীরা ঋণ বিতরণে গতি আনতে একগুচ্ছ দাবি জানিয়েছেন। তাদের পরামর্শের মধ্যে রয়েছে—পুরোপুরি বা আংশিক বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পুনরুজ্জীবনের সম্ভাব্যতা, সম্পদ, উৎপাদন সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে যাচাই করে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা। এছাড়া বন্ধ প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে খেলাপি হওয়াকে একমাত্র অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা না করে প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়নের সুযোগ দেওয়া, খেলাপির তালিকা থেকে নাম মুছতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া, একই গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানের খেলাপির কারণে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকিং সুবিধা বন্ধ না করা এবং বিচারাধীন মামলার ক্ষেত্রে মামলা প্রত্যাহার বা নিষ্পত্তির শর্ত পুনর্বিবেচনা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

পাশাপাশি পুনরায় উৎপাদন চালুর স্বার্থে খেলাপিমুক্ত হতে ২ শতাংশ নগদ টাকা জমার শর্ত প্রত্যাহার, দ্রুত ঋণ অনুমোদনের জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা প্রদান, বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে একটি সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন, ১০ শতাংশের বেশি ঋণ খেলাপি থাকা ব্যাংকগুলোকে পুনঃ অর্থায়নের আওতায় আনা, মেয়াদি ঋণের শ্রেণিকরণে মেয়াদোত্তীর্ণ কিস্তির সংখ্যা ৩টির পরিবর্তে ৬টিতে উন্নীত করা, ঋণ আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং খেলাপিমুক্ত হওয়ার নীতি সহায়তার মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “অর্থনীতির গতি ফেরাতে হলে বন্ধ কলকারখানা চালুর বিকল্প নেই। একটা নতুন কারখানা তৈরি করতে কয়েক বছর সময় লাগে। সেই তুলনায় বন্ধ কারখানা চালু করা কম সময়সাপেক্ষ। তাই আমরা প্রণোদনা তহবিল বিতরণ বাড়াতে কিছু শর্ত শিথিলের দাবি জানিয়েছি।”