কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যে পুরো উপন্যাস লেখার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কানাডীয়-হাইতীয় লেখক থেলিসোঁ ওরেলিয়েনের বিরুদ্ধে। এই বিতর্কের মুখে ফ্রান্সের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার গঁকুরের দীর্ঘ তালিকা থেকে তাঁর উপন্যাসটি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

পুরস্কারের আয়োজক প্রতিষ্ঠান আকাদেমি গঁকুর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতা এবং পুরস্কারের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতেই থেলিসোঁ ওরেলিয়েনের লেখা 'সেতেঁ সা উ মুরির' উপন্যাসটি তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

৩৮ বছর বয়সী ওরেলিয়েন হাইতিতে জন্মগ্রহণ করেছেন। তাঁর এই উপন্যাসে একজন ইতিহাস ও ভূগোল শিক্ষকের আত্মকথন ফুটে উঠেছে। গ্যাং সহিংসতায় বিপর্যস্ত নিজ দেশ থেকে পালিয়ে ১২টি দেশ অতিক্রম করে এক ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার পর কানাডায় আশ্রয় নেওয়ার গল্প বলা হয়েছে বইটিতে।

গত আগস্টে ফ্রান্সে গ্রাসে প্রকাশনী থেকে বইটি বাজারে আসে এবং এরই মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার কপি বিক্রি হয়েছে। উপন্যাসটি ইতিপূর্বে ফনাক উপন্যাস পুরস্কার জয় করেছে এবং ২০টিরও বেশি দেশে বইটির অনুবাদ প্রকাশের স্বত্ব বিক্রি করা হয়েছে।

তবে গত ২১ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) বইটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে লেখা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঠিক যে দিনই এই অভিযোগ সামনে আসে, সেদিনই উপন্যাসটি ফনাক উপন্যাস পুরস্কার লাভ করে।

‘ব্যালান্স তোঁ ক্লদ’ নামের একটি বেনামি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট দাবি করে, তারা প্যাংগ্রাম নামক একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখেছেন যে উপন্যাসটি এআই দিয়ে লেখা কি না। তাদের দাবি, বইটির ‘প্রায় পুরোটাই’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে লেখা। যদিও এই ধরনের সফটওয়্যারের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ফরাসি কিছু সংবাদমাধ্যম অন্য শনাক্তকারী সফটওয়্যার দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছে যে, বইটি মানুষের লেখা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

লেখক থেলিসোঁ ওরেলিয়েন এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন এবং দাবি করেছেন যে, এটি মূলত বর্ণবিদ্বেষ থেকে করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি সব সময় সৃষ্টিশীলতা ও লেখালেখি ভালোবেসেছি। আমি কেন একটি যন্ত্র ব্যবহার করতে যাব, সেটাই বুঝি না।’

ফরাসি সংবাদপত্র লিবেরাসিওঁকে তিনি আরও বলেন, ‘আমার লেখায় হাইতি ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের নিজস্ব ভাষা ও ছন্দ ব্যবহার করা হয়েছে। চিত্রকল্প, পুনরাবৃত্তি ও ছন্দ এগুলো আমার নিজস্ব।’

পরবর্তীতে জানা যায়, যে বেনামি অ্যাকাউন্ট থেকে অভিযোগটি তোলা হয়েছিল, তার প্রকৃত পরিচয়। ফরাসি সংবাদপত্র লে ফিগারো জানিয়েছে, ওই অ্যাকাউন্টটির মালিক তাদেরই একজন কলাম লেখক স্যামুয়েল ফিতুসি। ফিতুসি তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে লিখেছেন যে, প্রযুক্তির প্রতি তাঁর আস্থা থাকলেও তিনি আশঙ্কা করেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একসময় মানুষের পড়ার ও লেখার অভ্যাস বিলীন করে দিতে পারে। সেই উদ্বেগ থেকেই তিনি এই প্রচার শুরু করেছিলেন।

উপন্যাসটির মূল প্রকাশক কানাডার বোরেয়াল প্রকাশনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, লেখককে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো তারা এই মুহূর্তে নিশ্চিত বা অস্বীকার করতে পারছে না। তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রকাশক বলেন, ‘বিশ্বাসযোগ্য ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া এই বই প্রকাশের অধিকার আছে কি না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়া আমাদের কাজ নয়।’

দক্ষিণ ফ্রান্সের মানোস্ক শহরের একটি সাহিত্য উৎসবে বক্তব্য দেওয়ার সময় ওরেলিয়েন বলেন, ‘কেবল বইটিকে আক্রমণ করার চেষ্টা নয়, বিশেষ করে আমার কণ্ঠকেই আক্রমণ করা হচ্ছে…আমাকে চুপ করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।’ তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি এই বিতর্ক থেকে দূরে থাকতে চান এবং সর্বশেষ অভিযোগগুলো নিয়ে আর কোনো মন্তব্য করবেন না।

উল্লেখ্য, আকাদেমি গঁকুর ৬ অক্টোবর পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকা ঘোষণা করেছে এবং আগামী ৪ নভেম্বর বিজয়ীর নাম চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা হবে।