কয়েক দশক ধরে সাহিত্যের পাতায় যে গল্পের আবেদন অম্লান ছিল, সেই কালজয়ী কাহিনীকেই এবার পর্দায় নতুন আঙ্গিকে ফুটিয়ে তুলেছে নেটফ্লিক্স। মার্কিন প্রখ্যাত লেখক জন স্টাইনবেকের অমর উপন্যাস ‘ইস্ট অব ইডেন’-এর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত সাত পর্বের এই সিরিজটি মুক্তির পর থেকেই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সিরিজের কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন ব্রিটিশ তারকা অভিনেত্রী ফ্লোরেন্স পিউ। তাঁর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা গেছে ক্রিস্টোফার অ্যাবট, মাইক ফাইস্ট এবং হুন লিকে। পারিবারিক কলহ, মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং ভালো ও মন্দের চিরন্তন লড়াইয়ের এক অনন্য সংমিশ্রণ এই সিরিজটি, যা ইতিমধ্যে সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
গত ১ অক্টোবর নেটফ্লিক্স প্ল্যাটফর্মে সিরিজটি মুক্তি পায়। ফোর্বসের ১ অক্টোবরের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুক্তির দিনই রিভিউ সংগ্রহের জনপ্রিয় ওয়েবসাইট রটেন টম্যাটোজে ২৭টি সমালোচনার ভিত্তিতে সিরিজটির স্কোর ছিল ৮৯ শতাংশ। পরবর্তীতে ভ্যারাইটি এবং দ্য হলিউড রিপোর্টারের মতো প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলোতেও এর নির্মাণশৈলী ও অভিনয় দক্ষতা নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা করা হয়েছে। নেটফ্লিক্সের বৈশ্বিক তালিকার শীর্ষে স্থান পাওয়ার পর দর্শকদের আগ্রহ আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রথম চার দিনে সিরিজটির ভিউ হয়েছে ৬৫ লাখ। এই সিরিজের প্রথম চারটি পর্ব পরিচালনা করেছেন গার্থ ডেভিস এবং বাকি তিনটি পর্বের নির্দেশনা দিয়েছেন লর দ্য ক্লেরমোঁ-টোনের।
দুই ভাই, এক নারী আর এক পরিবারের গল্প
‘ইস্ট অব ইডেন’-এর কাহিনী আবর্তিত হয়েছে বিশ শতকের শুরুর দিকের যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে। ক্যালিফোর্নিয়ার কৃষিপ্রধান স্যালিনাস উপত্যকার পটভূমিতে ট্রাস্ক পরিবারের কয়েক প্রজন্মের জীবনসংগ্রাম এখানে ফুটে উঠেছে। গল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ক্যাথি অ্যামস—যিনি একজন স্বাধীনচেতা, রহস্যময় এবং নিজের লক্ষ্য অর্জনে আপসহীন নারী।
ক্যাথির জীবনে প্রবেশ ঘটে দুই সৎভাই অ্যাডাম ও চার্লস ট্রাস্কের। তাঁদের পিতা সাইরাস ট্রাস্ক চেয়েছিলেন তাঁর দুই ছেলের জীবনকে নিজের ইচ্ছানুযায়ী গড়ে তুলতে। তবে পিতার একপেশে পক্ষপাত, উচ্চ প্রত্যাশা এবং কঠোর আচরণ দুই ভাইয়ের সম্পর্কের মাঝে এক গভীর দূরত্ব তৈরি করে। এই পারিবারিক টানাপোড়েনের মাঝে ক্যাথির আগমন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
গল্পের অ্যাডাম চরিত্রটি অত্যন্ত বিশ্বাসপ্রবণ এবং স্বপ্নবিলাসী। অন্যদিকে, চার্লসের চরিত্রে ফুটে উঠেছে সন্দেহপ্রবণতা এবং তীক্ষ্ণ বাস্তববোধ। ক্যাথির সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের ধরনও ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। এই তিন চরিত্রের মধ্যকার মানসিক টানাপোড়েন থেকেই জন্ম নেয় ভালোবাসা, প্রতারণা, ঈর্ষা এবং ক্ষমতার লড়াই।
তবে এই সিরিজটি কেবল একটি পরিবারের সম্পর্কের গল্পে সীমাবদ্ধ নয়। সময়ের পরিক্রমায় ক্যাথির জীবন পরিবর্তিত হয়। শৈশবের অন্ধকার অভিজ্ঞতা, সমাজের কঠোর বিধিনিষেধ এবং নিজের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার লড়াই তাঁকে এমন এক চরিত্রে পরিণত করে, যাঁকে কেবল ভালো বা মন্দ—এই নির্দিষ্ট পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়। এক পর্যায়ে তিনি নিজের পরিচয় বদলে নতুন জীবন শুরু করেন।
উপন্যাস থেকে পর্দায়
জন স্টাইনবেকের ‘ইস্ট অব ইডেন’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫২ সালে। আমেরিকান সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই উপন্যাসে বাইবেলের কেইন ও অ্যাবেলের গল্পের প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়। দুই ভাইয়ের দ্বন্দ্বের মাধ্যমে লেখক এখানে ঈর্ষা, পাপ, পারিবারিক উত্তরাধিকার এবং মানুষের নিজস্ব পথ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতার বিষয়টি অনুসন্ধান করেছেন।
চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এই উপন্যাসের একটি পরিচিত অধ্যায় রয়েছে। ১৯৫৫ সালে নির্মাতা এলিয়া কাজান একই নামে একটি সিনেমা নির্মাণ করেন, যেখানে অভিনয় করেছিলেন জেমস ডিন। তবে সেই সিনেমাটি উপন্যাসের সম্পূর্ণ কাহিনী তুলে ধরতে পারেনি; বরং গল্পের শেষাংশের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
নতুন এই সিরিজের নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকার জো কাজান, যিনি এলিয়া কাজানের নাতনি। ফলে এই সাহিত্যকর্মটির সঙ্গে তাঁর একটি পারিবারিক যোগসূত্র রয়েছে। তবে নতুন এই সিরিজটি কেবল আগের সিনেমার পুনর্নির্মাণ নয়, বরং উপন্যাসের বিস্তৃত কাহিনীকে নতুনভাবে উপস্থাপন করার একটি প্রচেষ্টা।
তবে চরিত্রের অতীত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নির্মাতা কিছু ক্ষেত্রে মূল উপন্যাসের চেয়ে ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন। এই পরিবর্তন নিয়ে সমালোচকদের মধ্যে মতভেদ দেখা গেছে। কারো মতে, এই পরিবর্তনের ফলে চরিত্রটি আরও মানবিক হয়ে উঠেছে; আবার অনেকের মতে, ব্যাখ্যার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ায় চরিত্রের রহস্যময়তা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।
ফ্লোরেন্স পিউর অভিনয় কেন আলোচনায়
ক্যাথি অ্যামস চরিত্রে ফ্লোরেন্স পিউর অভিনয় এই সিরিজটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চরিত্রের বয়স, অভিজ্ঞতা এবং পরিস্থিতির পরিবর্তনের সাথে সাথে তাঁর অভিব্যক্তি ও আচরণেও এসেছে স্পষ্ট ভিন্নতা। কখনো অসহায়, কখনো অত্যন্ত হিসাবি, আবার কখনো নির্মম—বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ক্যাথি চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন তিনি।
‘লিটল উইমেন’, ‘মিডসামার’ এবং ‘ডোন্ট ওরি ডার্লিং’-এর মতো কাজের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া ফ্লোরেন্স পিউ এখানে এমন একটি চরিত্র পেয়েছেন, যার ভেতরে রয়েছে বহুস্তরীয় দ্বন্দ্ব। ক্যাথির স্বাধীনচেতা মনোভাব যেমন দর্শককে আকর্ষণ করে, তেমনি তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্তের নিষ্ঠুর পরিণতি দর্শকদের মনে অস্বস্তিও তৈরি করে।
আইএমডিবি, ভ্যারাইটি ও নেটফ্লিক্সডটকম অবলম্বনে