সাইকেলটির বয়স এখন ২৬ বছর। রং হয়ে গেছে পুরোনো, ক্ষয়ে গেছে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। তবুও প্রতিদিন সকাল হলেই সেই সাইকেলের প্যাডেলে পা রাখেন সুনীল চন্দ্র ধর। একসময় সাড়ে তিন হাজার টাকা ঋণ করে কেনা এই সাইকেলটিই আজ তার কর্মজীবনের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও বিশ্বস্ত সঙ্গী। বর্তমানে তার বয়স ৫৮ বছর। শরীরের অসারতা আর বয়সের ভারে আগের মতো দ্রুত গতিতে সাইকেল চালাতে পারেন না তিনি। তা সত্ত্বেও প্রতিদিন প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ডাক বিলির কাজ করে যাচ্ছেন সুনীল। রোদ কিংবা বৃষ্টি, ঠিকানার মানুষের হাতে ডাক পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালনে তিনি অবিচল।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার সুয়াবিল ইউনিয়নের বারোমাসিয়া গ্রামের resident যতীস চন্দ্র ধরের ছেলে সুনীল। ১৯৯৮ সালে নাজিরহাট উপডাকঘরে ডাকপিয়ন হিসেবে তার পেশাগত জীবন শুরু হয়। চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে তার জীবিকার প্রধান উৎস ছিল কৃষিকাজ। তবে চাকরিতে প্রবেশের পর মানুষের হাতে চিঠি, প্রয়োজনীয় নথি এবং খবর পৌঁছে দেওয়াই হয়ে ওঠে তার দৈনন্দিন রুটিন।
দীর্ঘ এই সময়ে মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম আমূল বদলে গেছে। সেই সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে ডাকপিয়নের ব্যাগের ধরনও। একসময় যে ব্যাগে ঠাসা থাকত অসংখ্য ব্যক্তিগত চিঠি, প্রিয়জনের খবর কিংবা দূর শহর থেকে আসা ভালোবাসার বার্তা, এখন সেখানে বেশি করে থাকে সরকারি চাকরির নিয়োগপত্র, আদালতের আদেশ, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দাপ্তরিক চিঠি ও আইনি নোটিশ। এই পরিবর্তন প্রসঙ্গে সুনীল বলেন, “ইদানীং বেশি আসছে বিবাহবিচ্ছেদের নোটিশ ও তালাকনামা।”
সুনীলের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে চিঠির আবেগের ক্ষেত্রে। পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “আগে আমরা যখন চিঠিপত্র নিয়ে মানুষের বাড়িতে যেতাম, তখন আমাদের দেখলেই মানুষ আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে আসত। কার চিঠি এসেছে, কোথা থেকে এসেছে জানার জন্য অপেক্ষা করত। চিঠি হাতে পাওয়ার পর মানুষের মুখের যে আনন্দ দেখতাম, তা এখনো মনে পড়ে।”
সেই সময়ের চিঠির গল্পগুলো তার স্মৃতিতে এখনো অমলিন। তার ভাষায়, “আগে ডাকের ব্যাগে প্রেমপত্র আসত, প্রিয়জনের চিঠি আসত। চিঠির জন্য মানুষ অপেক্ষা করত, চিঠি হাতে পেয়ে আনন্দও করত। এখন সেই চিঠি খুব একটা আসে না।”
প্রযুক্তির দ্রুত উৎকর্ষতায় অপেক্ষার সেই দিনগুলো এখন অতীত। মুঠোফোন, খুদে বার্তা ও ইন্টারনেটের যুগে মুহূর্তের মধ্যেই এক প্রান্তের খবর পৌঁছে যাচ্ছে অন্য প্রান্তে। ফলে ডাকপিয়নের ব্যাগে ব্যক্তিগত চিঠির জায়গা দখল করেছে দাপ্তরিক কাগজপত্র। একসময় খাকি খাম মানেই ছিল দীর্ঘ অপেক্ষা, আনন্দ কিংবা প্রিয়জনের সংবাদ। এখন সেই খামেই কখনো ভেসে আসে বিচ্ছেদের বার্তা। সুনীলের কর্মজীবনের এই অভিজ্ঞতা যেন সময়ের পরিবর্তনের এক নীরব দলিল।
তবে ডাক ব্যবস্থার এই পরিবর্তনের মাঝেও থেমে থাকেনি সুনীলের সাইকেল। প্রতিদিন সেই পুরোনো পনিক্স সাইকেলটি নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে মানুষের হাতে পৌঁছে দেন ডাক। কাজ শেষে সন্ধ্যায় সেই সাইকেলেই তিনি বাড়ি ফেরেন। বয়স বেড়েছে, প্যাডেলের গতি কমেছে; কিন্তু দায়িত্ব পালনের নিষ্ঠায় কোনো পরিবর্তন আসেনি।
পেশার পাশাপাশি কৃষির সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রেখেছেন সুনীল। কাজের ফাঁকে কিংবা ছুটির দিনে ছেলের সঙ্গে মাঠে নামেন তিনি। ডাক বিলি করা তার পেশা হলেও, কৃষিকাজ তার পুরোনো জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এক অবিচ্ছেদ্য পরিচয়।
২৮ বছরের কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে এসেও আর্থিক স্বচ্ছলতার কথা বলতে পারেন না তিনি। ডাক দিবসের প্রসঙ্গ উঠলে তার কণ্ঠে ফুটে ওঠে গভীর আক্ষেপ।
সুনীল বলেন, “দিবস দিয়ে কী হয়। আমাদের ভাগ্য তো পাল্টায় না। আমরা যে বেতন পাই, তাতে সংসার চালানো কঠিন। তারপরও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে এই পদটি আঁকড়ে ধরে আছি।”
তিনি আরও বলেন, “নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের যে ঊর্ধ্বগতি, তাতে আমরা যে বেতন পাই, তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছি। সরকারের কাছে আমাদের বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎসব বোনাস ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবি জানাই।”
চিঠির যুগ বদলেছে, বদলেছে মানুষের অপেক্ষার ধরন। বদলে গেছে ডাকপিয়নের ব্যাগে থাকা কাগজের গল্পগুলোও। কিন্তু ফটিকছড়ির পথে সুনীল চন্দ্র ধরের সেই পুরোনো পনিক্স সাইকেলটি এখনো ঘুরছে। সেই চাকার প্রতিটি ঘূর্ণনে যেন লেখা আছে তার ২৮ বছরের কর্মজীবনের গল্প—একজন ডাকপিয়নের গল্প, খাকি খামের গল্প, মানুষের অপেক্ষার গল্প এবং হারিয়ে যেতে বসা চিঠির যুগের এক জীবন্ত স্মৃতি।