কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানখেত থেকে ১৫ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে সন্দেহভাজন অটোরিকশাচালক সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে আটক করা হয়েছে। বর্তমানে তাকে পুলিশি হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। উদ্ধারকৃত অটোরিকশা, পোশাক এবং অন্যান্য সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

নিহত ছাত্রীর গ্রামের বাড়ি যশোর সদর উপজেলার একটি গ্রামে। গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীর রাতে তার মরদেহ যখন গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়, তখন পুরো পরিবারে শোকের মাতম নেমে আসে। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তার বাবা ও মা। আজ শুক্রবার সকাল ১০টায় জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

আজ দুপুরে স্থানীয় সাংবাদিকেরা যখন ছবি তুলতে যান, তখন নিহত ছাত্রীর মা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কী হবে ছবি তুলে? আমার কলিজার পাখিটা যখন চলে গেছে; এখন আর কিছু বলব না।” এরপর তিনি দাবি করেন, মেয়েটি যে বান্ধবীর বাসায় গিয়েছিল, তাকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটন হবে।

পুলিশি তদন্তে জানা গেছে, ৪ অক্টোবর ওই ছাত্রী বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হয়। সেখান থেকে সে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং পরবর্তীতে কুমিল্লায় ফিরে কক্সবাজারে যায়। গত বুধবার রাত ১২টার দিকে ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’ বাসে করে সে নগরের হোটেল নুরজাহানে নামে এবং সোয়া ১২টার দিকে সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। তার গন্তব্য ছিল নিজস্ব বাসা। তবে পরদিন সকালে লালমাইয়ের পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর উত্তরপাড়ার মানুমুড়া জঙ্গল-সংলগ্ন ধানখেতে তার মরদেহ পাওয়া যায়।

তদন্তকারী পুলিশ একটি বড় প্রশ্ন তুলেছে যে, পদুয়ার বাজারে নামার পর শহরের দিকে না গিয়ে মেয়েটি কীভাবে লালমাইয়ের নির্জন ফসলি জমিতে পৌঁছাল। মরদেহ উদ্ধারের সময় পাশে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পাওয়া যায়, যার ভেতরে মেয়েটির একটি পোশাক এবং পাশে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ পড়ে ছিল। এই অটোরিকশাটিই এখন মামলার প্রধান সূত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঘটনাস্থল ধানখেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে যে মেয়েটি জীবন বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করেছিল। পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, সন্দেহভাজন অটোরিকশাচালক সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে আটক করা হয়েছে এবং তার আগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার দুই নিকটাত্মীয়কেও হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল।

কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান আজ দুপুরে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “লালমাইয়ে কিশোরী হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশ কাজ করছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে একজনকে আটক করে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। দ্রুত এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানানো হবে।”

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আটক সুমন ওই অটোরিকশাটি ভাড়ায় নিয়ে চালাতেন। তার বাড়ি লালমাই-সংলগ্ন জয়নগর এলাকায় হলেও নিজের বাড়ি না থাকায় তিনি শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন। তিনি মূলত রাতে পদুয়ার বাজার ও আশপাশের এলাকায় যাত্রী পরিবহন করতেন। ঘটনার পর থেকে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও মুঠোফোন না থাকায় তার অবস্থান শনাক্ত করতে পুলিশের বেগ পেতে হয়, তবে শেষ পর্যন্ত তাকে আটক করা সম্ভব হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে জানিয়েছেন, সিএনজিচালককে কেন্দ্র করেই তদন্তের মোড় ঘুরছে। হত্যাকাণ্ডে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা আছে কি না এবং কিশোরীর মুঠোফোনসহ অন্যান্য মালামাল কোথায় আছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গতকাল সকালে স্থানীয় বাসিন্দারা সড়কের পাশে ধানখেতে অটোরিকশাটি পড়ে থাকতে দেখে সন্দেহ করেন। এরপর অটোরিকশা থেকে প্রায় ৩০ গজ দূরে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ এবং কিছুটা দূরে স্কুলছাত্রীর মরদেহ দেখতে পান তারা। ধানগাছ এলোমেলো ও ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে থাকায় তারা ধস্তাধস্তির কথা ধারণা করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. রুহুল আমিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ধানখেতডির ধানগাছ ভাঙাচোরা। ধস্তাধস্তির মতো চিহ্ন দেখলাম। মাইয়াডার মুখ-মাথা কাদায় ছিল আর গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। পরে এলাকার ২০-২৫ জন মিল্লা সিএনজিডা ধানখেত থিকা রাস্তায় তুলছে। সিএনজির ভিতরে মাইয়াডার একটা জামাও পাইছে। তার বাপে দেইখ্যা কইছে, এই জামা তাঁর মাইয়ার।”

পুলিশ আরও জানিয়েছে, নিহত ছাত্রী বুধবার বিকেলে এক শিক্ষকের মাধ্যমে পরিবারকে জানিয়েছিল যে সে রাতে বাসায় ফিরবে। পরবর্তীতে রাত পৌনে দুইটার দিকে সে তার বাবার মুঠোফোনে লালমাইয়ের ‘লাইভ লোকেশন’ পাঠিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানায়। তবে বাবা তখন ঘুমিয়ে থাকায় বার্তাটি দেখতে পাননি।

নিহত স্কুলছাত্রীর বাবা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সকালে মেসেজ দেখি। তারপর লাইভ লোকেশনে গিয়ে মেয়ের মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে দেখতে পাই।” তিনি আরও বলেন, “এখন কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে চাই না। আমার মেয়ের সঙ্গে কী হয়েছে, কারা তাকে হত্যা করেছে, পুরো ঘটনা জানতে চাই। জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করার দাবি জানাই।”

কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ঘটনাস্থল ধানখেতজুড়ে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, জীবন বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করেছিল ওই ছাত্রী। এ ঘটনায় তার বাবা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লালমাই থানায় একটি মামলা করেছেন। ইতিমধ্যে আজ সকালে চট্টগ্রাম থেকে সিএনজিচালক সুমনকে আটক করেছে পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বিস্তারিত সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তুলে ধরা হবে।”