জুলাই গণ–অভ্যুত্থান আমাদের সামনে রাষ্ট্র সম্পর্কে একটি মৌলিক প্রশ্ন রেখে গেছে—রাষ্ট্র কাদের জন্য? যদি উত্তর হয়—রাষ্ট্র তার সব নাগরিকের জন্য, তাহলে নারীকে রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে স্বীকার করা কোনো বিশেষ অধিকারের প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিকত্বের মৌলিক সমতার প্রশ্ন। লিখেছেন মিল্লাত হোসেন
সময় প্রায় মধ্যরাত, তারিখ ১৪ জুলাই ২০২৪। স্থান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল। হলের ফটকের দোরগোড়ায় একদল ছাত্রী। বাইরে তখন তৎকালীন সরকারপ্রধান কর্তৃক কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলে গালি দেওয়ার প্রতিবাদী ছাত্ররা। অথচ ছাত্রী হলে নিরাপত্তার লৌহকপাট; মেয়েদের বের হতে দেওয়া হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত ছাত্রীরা সেই রুদ্ধদ্বার ভেঙে বাইরে বেরিয়ে এলেন।
ঘটনাটি ছোট—একটি হলের গেট খুলে বেরিয়ে আসা। কিন্তু বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে একটু দূর থেকে তাকালে বোঝা যায়, সেটি কেবল একটি গেট খোলা ছিল না। এ যেন ছিল এক ‘লক্ষণরেখা’ অতিক্রমের মুহূর্ত, যেখানে নারীরা আর অপেক্ষা করেননি কেউ তাঁদের জন্য রাজনৈতিক পরিসরের দরজা খুলে দেবেন বলে। তাঁরা নিজেরাই সেই লৌহকপাট খুলে রাস্তায় নেমেছিলেন। আগল ভেঙে বেরিয়ে আসা নারীদের সবার সামনে যে দুজন, তাঁদের একজন হিজাব-বোরকাধারী আর অপরজন জিনস ও টি–শার্ট পরিহিতা—এটি ছিল জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের অন্যতম ‘আইকনিক’ ছবি।
জুলাই ২০২৪–এর বাংলাদেশে দেখা এক চিত্তাকর্ষক দৃশ্য ছিল—রাজপথে নারী। তবে তা শুধু সাংবাদিকের ক্যামেরায় নান্দনিকতা আনার গৎবাঁধা দৃশ্যে সামনের সারিতে অলংকার বা দর্শক হিসেবে নয়, আন্দোলনের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে ছিল নারী। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, তরুণী, শিক্ষক, পেশাজীবী, শ্রমজীবী নারী—বিভিন্ন সামাজিক পরিসর থেকে এসে দাঁড়িয়েছিলেন রাষ্ট্রের মুখোমুখি। আক্রমণের শিকার হয়ে কেবল প্রতিহতই করেননি, প্রত্যাঘাতও করেছেন। কেউ স্লোগান দিয়েছেন, কেউ আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা করেছেন, কেউ খাবার ও পানি পৌঁছে দিয়েছেন, কেউ সহযোদ্ধাদের আড়াল করে পুলিশের আক্রমণ মোকাবিলা করেছেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনে নারীর উপস্থিতি অবশ্য নতুন নয়। কিন্তু জুলাইয়ের তাৎপর্য ছিল অন্যত্র। এই অভ্যুত্থান যেন দৃশ্যমান করে দিয়েছিল একটি সত্য—নারী কেবল রাজনীতির অংশগ্রহণকারী নয়, সে নিজেই রাজনৈতিক শক্তি।
কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি এখানেই: জুলাইয়ের রাস্তায় যে নারীরা এত দৃশ্যমান ছিলেন, জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামোয় তাঁরা কোথায় গেলেন? প্রশ্নটি ওঠে এ কারণে যে গণ–অভ্যুত্থানের সাফল্য শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনে নয়; আসল পরীক্ষা হলো রাষ্ট্রের চরিত্র কতটা বদলাল তাতে। জুলাই যদি কেবল একটি সরকারের পতনের ঘটনা হয়, তার তাৎপর্য এক রকম। কিন্তু যদি এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার আকাঙ্ক্ষা হয়ে থাকে, তাহলে নারী-পুরুষনির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের মর্যাদা, অধিকার ও অংশগ্রহণ তার কেন্দ্রেই থাকার কথা ছিল। এ জায়গাতেই জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের সঙ্গে নারী প্রশ্নটির গভীর সংযোগ।
জুলাইয়ের আন্দোলন একটি নির্দিষ্ট দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও রাষ্ট্রীয় দমন, বৈষম্য, অন্যায় ও জবাবদিহিহীনতার অভিজ্ঞতা তাকে বৃহত্তর রাজনৈতিক অভ্যুত্থানে পরিণত করে। আন্দোলনের প্রশ্ন হয়ে ওঠে রাষ্ট্রে জেঁকে বসা স্বৈরাচারী ক্ষমতার কাঠামো উৎখাত, নাগরিকের মর্যাদা এবং রাজনৈতিক জবাবদিহি।
জুলাইয়ের একজন নারী যখন রাষ্ট্রের কাছে নিজের অধিকার দাবি করেন, তাঁর দাবি শুধু সেই মুহূর্তের রাজনৈতিক দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় আরও গভীর প্রশ্ন—পরিবারে তাঁর অবস্থান কী, আইনের চোখে তিনি কতটা সমান, সম্পত্তিতে তাঁর অধিকার কতটা, বিবাহ-সন্তান লাভ তাঁর নাগরিক স্বাধীনতাকে কতটা সীমাবদ্ধ করে, কর্মক্ষেত্রে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে, আইনসভায় তাঁর প্রতিনিধিত্ব কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর কণ্ঠের মূল্য কতটা। অর্থাৎ জুলাই নারীর প্রশ্নকে নতুন করে রাষ্ট্রের প্রশ্নে পরিণত করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি করেছিল।
কিন্তু রাষ্ট্র যখন নিজেকে পুনর্গঠনের কাজে প্রবেশ করল, তখন সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো হলো? অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশসহ রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান নিয়ে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন বাদ দিলে রাষ্ট্র সংস্কারের অন্য ১০টি কমিশনের ৯৭ সদস্যের মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র ১৫ জন; কোনো নারী সেই কমিশনগুলোর নেতৃত্বেও ছিলেন না। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনেও নারীর উপস্থিতি ছিল না।
নারীকে কেবল সুরক্ষার প্রয়োজন, এমন একটি ‘দুর্বল জনগোষ্ঠী’ হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রের আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই যে বৈষম্য নিহিত আছে, সেগুলো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে আনা হয়েছিল।
অর্থাৎ যে রাষ্ট্রের পরিবর্তনের জন্য নারীরা জুলাইয়ে রাস্তায় পুরুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই রাষ্ট্রের নতুন নকশা আঁকার টেবিলে তাঁদের উপস্থিতি হয়ে গেল নগণ্য। এটি নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়। এর মধ্যে একটি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি কাজ করে, ক্ষমতা যখন বিপন্ন, তখন নারীকে প্রয়োজন হয়; কিন্তু ক্ষমতা যখন পুনর্বণ্টনের প্রশ্নে আসে, তখন নারী আবার প্রান্তে সরে যেতে বাধ্য।
কেউ কেউ এমন প্রশ্নও করেছিলেন, শুধু নারীদের নিয়েই কমিশন করা কেন। নারী–প্রশ্ন যেকোনো রাষ্ট্রেরই একটি প্রধান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নও বটে। এমন একটি গুরুতর রাষ্ট্রীয় ইস্যুতে কমিশনে পুরুষকে না রেখে শুধু নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করাকে দেশের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা কি না, সেই সমালোচনাও হয়েছিল।
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কমিশন ১৫টি ক্ষেত্রে ৪৩৩টি সুপারিশ করেছিল—সংবিধান ও আইন, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, স্থানীয় সরকার, প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, শ্রম, সম্পত্তি, সহিংসতা প্রতিরোধ, সামাজিক সুরক্ষা, গণমাধ্যম ও সংস্কৃতি পর্যন্ত। এর গুরুত্ব শুধু সুপারিশের সংখ্যায় নয়, এর অন্তর্নিহিত রাষ্ট্রচিন্তায়।
নারীকে কেবল সুরক্ষার প্রয়োজন, এমন একটি ‘দুর্বল জনগোষ্ঠী’ হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রের আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই যে বৈষম্য নিহিত আছে, সেগুলো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে আনা হয়েছিল।
রাষ্ট্র সংস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি ছিল রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব। বাংলাদেশের আইনসভায় নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। কিন্তু এই আসনগুলোতে নারীরা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। ফলে সংখ্যাগত প্রতিনিধিত্ব থাকলেও রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক অনেক সময় দলীয় কাঠামোর মধ্যস্থতানির্ভর হয়ে পড়ে। জুলাই-পরবর্তী সংস্কার আলোচনায় এ প্রশ্ন নতুন করে গুরুত্ব পায়।
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন ৬০০ সদস্যের সংসদের প্রস্তাব করেছিল। সেখানে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার জন্য একটি সাধারণ ও একটি নারী আসন এবং নারী আসনেও সরাসরি ভোটের ব্যবস্থার কথা ছিল। অর্থাৎ নারীকে শুধু সংসদে উপস্থিত করা নয়, তাঁকে সরাসরি নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
অন্যদিকে জুলাই জাতীয় সনদ ও জাতীয় ঐকমত্য প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন বহাল রাখার পাশাপাশি সাধারণ আসনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়। পরবর্তী নির্বাচনে অন্তত ৫ শতাংশ, পরের নির্বাচনে ১০ শতাংশ এবং পরবর্তী প্রতিটি নির্বাচনে আরও ৫ শতাংশ করে বাড়িয়ে ৩৩ শতাংশে পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
দুই প্রস্তাবের পার্থক্য শুধু সংখ্যার নয়, রাজনৈতিক দর্শনেরও। একটি প্রশ্ন করে, নারীকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার স্বতন্ত্র অংশীদার হিসেবে কীভাবে নিশ্চিত করা যায়? অন্যটি প্রশ্ন করে, বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে ধীরে ধীরে নারীর প্রবেশ কীভাবে বাড়ানো যায়? দ্বিতীয় পথটি বাস্তববাদী হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তববাদ কখনো কখনো বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামোকেও অক্ষুণ্ন রাখে। তখন প্রশ্ন ওঠে, আমরা কি রাষ্ট্রকে বদলাচ্ছি, নাকি পুরোনো রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে কিছু নতুন মুখের জন্য জায়গা তৈরি করছি?
রাষ্ট্র সংস্কারের কঠিন দ্বন্দ্বটি এখানেই সামনে আসে। একদিকে ছিল বৈষম্য দূর করা, পারিবারিক আইনে সমতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মতো সুদূরপ্রসারী প্রস্তাব। অন্যদিকে রাজনৈতিক সমঝোতার বাস্তবতায় অনেক প্রস্তাবই সীমিত, ধীরগতির কিংবা পর্যায়ক্রমিক রূপ পেয়েছে।
একটি সমাজের রাজনৈতিক সংস্কার যত দ্রুত ঘটে, সামাজিক সংস্কার তত দ্রুত ঘটে না। জুলাই রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্ন করার সাহস তৈরি করেছে। কিন্তু পরিবার, সম্পত্তি, বিবাহ ও সামাজিক ভূমিকা সম্পর্কে দীর্ঘদিনের ধারণা বদলানো আরও দীর্ঘ সংগ্রামের বিষয়। তবু রাষ্ট্রের কাজ কেবল সমাজের বিদ্যমান বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া নয়। কখনো কখনো রাষ্ট্রকেই সমাজের সামনে একটি নতুন ন্যায়ের মানদণ্ড স্থাপন করতে হয়।
কন্যাশিশু কি কেবল নিরাপদ থাকবে, নাকি স্বাধীনও হবে? সে কি কেবল শিক্ষিত হবে, নাকি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও অর্জন করবে? সে কি কেবল ভোট দেবে, নাকি একদিন রাষ্ট্রও পরিচালনা করবে? যে রাষ্ট্র তার কন্যাশিশুকে সমান নাগরিক হিসেবে দেখতে শেখেনি, তার রাষ্ট্র সংস্কার যত ব্যাপকই হোক, তা শেষ পর্যন্ত অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
এই প্রশ্ন তীব্র হয় জুলাইয়ের নারীদের স্বীকৃতির প্রসঙ্গে। ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসে ৫৫টি নারী অধিকার সংগঠনের জোট জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী নারীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারীর সমান প্রতিনিধিত্বসহ ১১ দফা দাবি জানিয়েছিল। এর তাৎপর্য গভীর। কারণ, কোনো গণ–অভ্যুত্থানে নারীর অংশগ্রহণকে শুধু স্মারকে পরিণত করা হলে একধরনের রাজনৈতিক বিস্মরণ তৈরি হয়।
কোনো নারী জুলাইয়ে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, প্রিজন ভ্যান আটকে দিয়েছিলেন—এসব ইতিহাস। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যে রাষ্ট্রের পরিবর্তনের জন্য তিনি দাঁড়িয়েছিলেন, সেই পরিবর্তিত রাষ্ট্রের কাঠামোয় তাঁর নিজের স্থান কোথায়? তাঁকে যদি শুধু ‘জুলাইয়ের নারী সাহসিনী’ হিসেবে স্মরণ করা হয়; কিন্তু সংসদ, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, সংস্কার কমিশন কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর জায়গা তৈরি না হয়, তাহলে সেই স্মরণ একসময় প্রতীকে পরিণত হয়।
এখানেই দৃশ্যমানতা ও ক্ষমতার পার্থক্য। নারীকে মঞ্চে দেখা যেতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্তের টেবিলে নয়। তাঁকে আন্দোলনে–অভ্যুত্থানে দেখা যেতে পারে, কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্রের নকশায় তাঁর মতামত অনুপস্থিত থাকতে পারে। জুলাই-পরবর্তী রাজনীতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য সম্ভবত এটাই।
রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এই দীর্ঘ রাজনৈতিক আলোচনার সবচেয়ে দূরবর্তী প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে আজকের কন্যাশিশুটি। সে হয়তো এখনো জানে না জুলাই কী ছিল। জানে না সংস্কার কমিশন কী, জাতীয় সনদ কী। কিন্তু আগামী দিনের বাংলাদেশ তার জীবনেই এই বিতর্কগুলোর ফলাফল লিখবে। সে কি এমন একটি পরিবারে বড় হবে, যেখানে তার অধিকার এক ধাপ নিচে? এমন একটি সমাজে, যেখানে তার নিরাপত্তার অর্থ তার চলাফেরার ওপর নিয়ন্ত্রণ? এমন একটি রাষ্ট্রে, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এখনো পুরুষের স্বাভাবিক অধিকার এবং নারীর জন্য একটি ‘বিশেষ ব্যবস্থা’?
রাষ্ট্র সংস্কারের সাফল্য শেষ পর্যন্ত সংবিধানের কতগুলো অনুচ্ছেদ পরিবর্তিত হলো, তার মধ্যে যতটা নয়; একটি কন্যাশিশুর জীবনে রাষ্ট্র কতটা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করল, তার মধ্যেই এর প্রকৃত সাফল্য ধরা পড়বে। জুলাই আমাদের সামনে রাষ্ট্র সম্পর্কে একটি মৌলিক প্রশ্ন রেখে গেছে—রাষ্ট্র কাদের জন্য? যদি উত্তর হয়—রাষ্ট্র তার সব নাগরিকের জন্য, তাহলে নারীকে রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে স্বীকার করা কোনো বিশেষ অধিকারের প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিকত্বের মৌলিক সমতার প্রশ্ন।
কন্যাশিশু কি কেবল নিরাপদ থাকবে, নাকি স্বাধীনও হবে? সে কি কেবল শিক্ষিত হবে, নাকি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও অর্জন করবে? সে কি কেবল ভোট দেবে, নাকি একদিন রাষ্ট্রও পরিচালনা করবে? যে রাষ্ট্র তার কন্যাশিশুকে সমান নাগরিক হিসেবে দেখতে শেখেনি, তার রাষ্ট্র সংস্কার যত ব্যাপকই হোক, তা শেষ পর্যন্ত অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আর যে কন্যাশিশু আজ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করতে শেখে, তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে জুলাইয়ের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার; এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন, যেখানে স্বাধীনতা লিঙ্গনির্ভর হবে না।
মিল্লাত হোসেন আইন–আদালতবিষয়ক লেখক
মতামত লেখকের নিজস্ব