রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অবস্থিত সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে মূল মঞ্চ পর্যন্ত চারদিকে ছড়িয়ে ছিল নানা রঙের ঘুড়ি। আর মঞ্চের চারপাশ সাজানো হয়েছিল শুভ্র কাশফুলে। সব মিলিয়ে এক মনোরম পরিবেশে শরৎকে বরণ করে নেওয়ার আয়োজন করা হয়। আশ্বিন মাস প্রায় শেষ হতে চলেছে, আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনা আর নদীর পাড়ে কাশফুলের সমারোহ—ঠিক এই সময়েই ছায়ানটের শরতের বিশেষ অনুষ্ঠান ‘যোগ দে রে আজ সমান তানে’ ঘিরে সাজানো হয়েছিল পুরো চত্বর। সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের সঙ্গে যৌথভাবে এই আয়োজনের দায়িত্ব পালন করে ছায়ানট।
এই উৎসবে কেবল এই দুই প্রতিষ্ঠানই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সুরে সুর মেলাতে অংশ নিয়েছিল নালন্দা উচ্চবিদ্যালয়, এক্সেল একাডেমি এবং সেন্ট যোসেফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
সকাল ঠিক সাড়ে সাতটায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শরতে আজ কোন্ অতিথি’ শিরোনামের সম্মেলক গান ও নৃত্যের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়। পাঁচ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সমবেত কণ্ঠের সাথে ছায়ানটের শিল্পীরা নৃত্য পরিবেশন করেন। সূচনা পর্বের পর একে একে মঞ্চে পরিবেশিত হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও অতুল প্রসাদ সেনের গান, ছড়া এবং কবিতা আবৃত্তি।
নালন্দা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরিবেশন করেন ‘আলোর অমল কমলখানি’ ও ‘শরৎ (আজি কি তোমার মধুর মুরতি)’ গান দুটি। পাশাপাশি সুনির্মল বসুর ‘সবার আমি ছাত্র’ কবিতাটি তারা বৃন্দ আবৃত্তির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন। এই পর্বে একক গান হিসেবে মেহেরিন ফাতেমা ও সুদর্শনা অলকানন্দা কুণ্ডু যথাক্রমে ‘তোমরা যা বলো তাই বলো’ ও ‘ভোরের ঝিলের জলে’ গান দুটি পরিবেশন করেন।
এক্সেল একাডেমির নিবেদনে পরিবেশিত হয় সম্মেলক নৃত্যগীত ‘দেখো-দেখো, দেখো, শুকতারা আঁখি’। এছাড়া একক সংগীত পরিবেশন করেন অরুণাভ দে ও ইপ্সিতা সিকদার।
সেন্ট যোসেফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা গেয়ে শোনান ‘কোন্ খেপা শ্রাবণ ছুটে এল’ গানটি। এই পর্বে ইজমির মুস্তাফিজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শরৎ (এসেছে শরৎ, হিমের পরশ)’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন। এরপর উক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা দলবদ্ধভাবে কাজী নজরুল ইসলামের ‘কোন্ শরতে পূর্ণিমা-চাঁদ’ কবিতাটি আবৃত্তি করে শোনান।
সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে শোনা যায় ‘আজ প্রথম ফুলের পাব প্রসাদখানি’ গানটি। একক কণ্ঠে সার্থক সাহা পরিবেশন করেন ‘এসো শারদ প্রাতের পথিক’, বাঁধন কুণ্ডু গান ‘হৃদয়ে ছিলে জেগে’ এবং দিব্যময় দেশ গেয়ে শোনান ‘মেঘেরা দল বেঁধে যায়’।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে ছিল ছায়ানটের বিশেষ পরিবেশনা। ‘ওগো শেফালিবনের মনের কামনা’ গানের মাধ্যমে শুরু হয় তাদের সমবেত গান ও দলীয় নাচ। এরপর অঙ্কিতা সরকার গেয়ে শোনান ‘অমল ধবল পালে লেগেছে’, শতদ্রু সরকার পরিবেশন করেন ‘আমার রাত পোহালে’ এবং প্রেমা দেওয়ানগাজী গেয়ে শোনান ‘হে ক্ষণিকের অতিথি’। সবশেষে পার্থিব সাহার কণ্ঠে ‘শিউলি ফুল শিউলি ফুল’ গানের মাধ্যমে সংগীত আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।
পুরো অনুষ্ঠানের ইতি টানল সব প্রতিষ্ঠানের যৌথ কণ্ঠে পরিবেশিত ‘আজ ধানের ক্ষেতে’ সম্মেলক নৃত্যগীত এবং জাতীয় সংগীত গাওয়ার মধ্য দিয়ে।
শিক্ষার্থীদের প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ছায়ানট সভাপতি সারওয়ার আলী। তিনি বলেন, ‘আমাদের ষড়্ঋতুর দেশে ঋতুভিত্তিক বৈচিত্র্য রয়েছে। বিশেষ করে শরতের স্নিগ্ধতা-বৃষ্টিহীন নীল আকাশ, মেঘের ভেলা, ফুটন্ত কাশবন ও শিউলি ফুল মিলিয়ে শরতের যে নিজস্ব রূপ, তা শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছে ছায়ানট।’
সারওয়ার আলী আরও বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রকৃতির সান্নিধ্যে এনে এবং তাদের মাধ্যমে এই সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিয়ে চলমান প্রকৃতিবিনাশী কার্যক্রম অনেকটাই প্রশমিত করা সম্ভব।’