রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার খুচরা বাজারে গত এক থেকে দেড় সপ্তাহের ব্যবধানে সরু চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু সরু চালই নয়, অন্যান্য জাতের চালের দামও কেজিপ্রতি ১ থেকে ২ টাকা বেড়েছে। চালের পাশাপাশি দেশি পেঁয়াজ, রসুন এবং খোলা সয়াবিন তেলের দামও বেড়েছে। অন্যদিকে, ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দাম আগের মতোই উচ্চমূল্যে অপরিবর্তিত রয়েছে।
খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, জ্বালানি তেলের সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এবার চালের বাজারে পড়েছে। পাইকারি বিক্রেতাদের মতে, তেলের দাম বাড়ায় চাল পরিবহনে ট্রাকভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশাপাশি মিল পর্যায়েও চালের দাম বাড়ানো হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, টাউন হল বাজার এবং আগারগাঁও তালতলা বাজার পরিদর্শনে গিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, খুচরা দোকানে ডায়মন্ড, মঞ্জুর, সাগর ও রশিদ ব্র্যান্ডের মিনিকেট চালের দাম কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গতকাল ডায়মন্ড, মঞ্জুর ও সাগর ব্র্যান্ডের মিনিকেট চাল প্রতি কেজি ৭৪ থেকে ৭৫ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে, যা গত সপ্তাহে ছিল ৭২ টাকা। অন্যদিকে, রশিদ ব্র্যান্ডের মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকা কেজি দরে; এক থেকে দেড় সপ্তাহ আগে এই চালের দাম কেজিতে ২ টাকা কম ছিল। মিনিকেট চালের মধ্যে মোজাম্মেল চালের দাম সবচেয়ে বেশি; বর্তমানে এর কেজি ৭৬ টাকা, যা গত সপ্তাহে ১ টাকা কম ছিল।
বাজারে বিভিন্ন মানের নাজিরশাইল চাল পাওয়া যাচ্ছে। মানভেদে এই সরু চালের কেজি এখন ৭০ থেকে ৯৫ টাকা। বিক্রেতাদের ভাষ্যমতে, নাজিরশাইল চালের দামও কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে।
মাঝারি মানের চালের দামেও বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাইজাম ও ব্রি-২৮, ব্রি-২৯ চালের কেজি এখন ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে মাঝারি মানের চালের দাম কেজিতে ৩ টাকা বেড়েছে। তবে মোটা চালের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে, যা কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৫৫ টাকার মধ্যে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিল পর্যায়েই চালের দাম বাড়ানো হয়েছে। নওগাঁর শিউলি অটোমেটিক রাইস মিলের মালিক আমিনুল ইসলাম জানান, সরু চালের মধ্যে কাটারি চালের দাম বস্তায় (৫০ কেজি) ৫০ টাকা বেড়েছে। অর্থাৎ পাইকারি বাজারে কাটারি চালের কেজিপ্রতি দাম ১ টাকা বেড়েছে। তবে অন্যান্য চাল আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে। ধানের মূল্যবৃদ্ধির কারণেই চালের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে জানান এই ব্যবসায়ী।
মিল পর্যায়ের মূল্যবৃদ্ধির সাথে যুক্ত হয়েছে বাড়তি ট্রাকভাড়া, যা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে হয়েছে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের চালের পাইকারি আড়ত বরিশাল রাইস এজেন্সির ব্যবস্থাপক মো. মহিউদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ধান সংগ্রহ থেকে শুরু করে পাইকারি বাজারে চাল আনা পর্যন্ত একাধিকবার ট্রাকের ব্যবহার হয়। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর প্রতিবার ট্রাকে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা বেশি ভাড়া লাগছে। এ কারণে পাইকারি পর্যায়ে চালের দাম গড়ে ১ টাকার মতো বেড়েছে।”
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের খুচরা চাল বিক্রেতা মো. লোকমান হোসেন বলেন, “এক গাড়িতে চাল থাকে ১৫ হাজার কেজি। কেজিতে ১ টাকা করে বাড়লে ১৫ হাজার টাকা বেশি লাগে। কিন্তু ট্রাক ভাড়া তো ২–৩ হাজার টাকা বেড়েছে। বাজারে তদারকি কম থাকায় আমাদের পাইকারি থেকে বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে। ফলে ক্রেতাদের কাছেও বেশি দামে চাল বিক্রি করতে হয়।”
রাজধানীর শেখেরটেক এলাকার বাসিন্দা এবং অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক শামীমা আক্তার গতকাল কৃষি মার্কেটে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বাজারে তো প্রতি সপ্তাহেই কোনো না কোনো জিনিসের দাম বাড়ে। দাম কমে খুব কম। আমরা মধ্যবিত্ত মানুষ। কষ্ট হলেও কাউকে কিছু বলতে পারি না।”
এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশি পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়েছে, যার ফলে প্রতি কেজি পেঁয়াজ এখন ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে গত বছরের এই সময়ে পেঁয়াজের কেজি ছিল ৭০ থেকে ৮০ টাকা, অর্থাৎ বর্তমান দাম গত বছরের তুলনায় ২৭ শতাংশ কম। এছাড়া এক সপ্তাহের মধ্যে রসুনের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত দুই সপ্তাহ ধরে বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিক্রেতাদের দাবি, কোম্পানিগুলো তেলের দাম বাড়াতে চায়, তাই তারা সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। সাধারণত বোতলজাত সয়াবিনের সংকট তৈরি হলে খোলা সয়াবিন তেলের চাহিদা ও দাম বেড়ে যায়। এবারও তেমনটি হয়েছে। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৫ টাকা বেড়েছে।
অন্যদিকে, ফার্মের মুরগি ও ডিমের দাম উচ্চমূল্যে স্থিতিশীল রয়েছে। ফার্মের মুরগির এক ডজন ডিম বর্তমানে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, তবে পাড়া-মহল্লার দোকানে এই দাম আরও ৫ টাকা বেশি। এছাড়া প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।